অলিখিত পত্র

আমিও তাকে মন্দ মেয়েই বলি।
মন্দ সে নয় জানি 
তবু মা বললো, নাকটা বোঁচা
ও মেয়েরা খুব খারাপ হয়।
কাকিমা বললো, হ্যাঁ মরুভূমির মত চোখ
সংসারে অকল্যাণ একেবারে
বাবা বললো, না। আমি দেখেছি লুকিয়ে কাঁদে
ওটা তো আরো খারাপ!

জ্যেঠিমার অভিযোগ আরো গুরুতর
ঈশ্বরে ভক্তি নেই মোটে
কেবল রবি ঠাকুর আর রবি ঠাকুর
কাব্যি করা মেয়ে বড় ভয়ংকর!

আমি তাকে ঠেসে ধরি দেওয়ালে
জানিস, কেন তোকে মারছি?
সে বলে, জানি না তো! আমি মন্দ বোধহয় খুব…

অবহেলা পেতে পেতে
মার খেতে খেতে 
তারপর একদিন সে চলে গেল।
আমি কোনদিন তার এ স্পর্ধা ভাবিনি

মা বললো, মন্দ! ছি!
কাকিমা বললো, দুয়ো!
বাবা বললো, অলক্ষ্মী ছিল বলেই এত খারাপ হচ্ছিল
আমি বললাম, বেশ তবে তাই হোক। 
সব ভালো হোক।

একদিন, দুদিন, দশ দিন…
আমার মধ্যে বাসা গড়লো অনাবৃষ্টি
ফুটিফাটা ধূ ধূ ফাঁকা মাঠ
বুকের বামদিকে বসে থাকা গোলাপি রঙের যন্ত্রটা বললো,
এর নাম দুর্ভিক্ষ।

খবর পেলাম আমার মন্দ মেয়ে তোমার সঙ্গে থাকে।
তোমার উঠোন জুড়ে বৃষ্টি 
ক্ষেতে পাকা ধান
খড়ের আঁটি বোঝাই নৌকা
তার পায়ে আলতা, কোমরে চাবি গুচ্ছ
নবান্নের আয়োজনে তোমার বাড়ি উৎসব লেগে থাকে বারোমাস

খবর পেলাম, আমার মন্দ মেয়ে তার আকাশ উপুড় করে তোমার বুকে
শব্দ বোনে, কাব্যি করে, ছবি আঁকে…

আমার কান্নার বর্ণমালা নেই।
শুধু মনে পড়ে এইতো সেদিন 
প্রবল উত্তাপ সারা শরীরে আমার
ব্যথায় দু চোখ বোজা…
কাজ শেষ করে সে এসে বসে আছে পাশে।
তার ভেজা আঁচল আমার কপাল জুড়ে শুয়ে
শুষে নেয় আমার সমস্ত উত্তাপ,
আমার ব্যথা।

ও আমার মন্দ মেয়ের নতুন জীবন!
তার কাছে ক্ষমা চাইবার বর্ণও আমি শিখিনি কখনো

একটা প্রশ্ন কেবল তোমার কাছে…

তোমায় যখন সে খুব আদর করে, জড়িয়ে ধরে
বুকের উপর খুব ঢেলে দেয় সুর
শীতলপাটি বিছিয়ে বসে গল্প বাঁধে আগাগোড়া
তখন, কোনোদিন…কখনো 
আমার মন্দ মেয়ে তোমার বুকে আমার জ্বর খুঁজে
পেয়েছে গো? 
বলো না! ও ভালো মানুষ! 

ও হ্যাঁ, ওকে একটা কথা বলে দিও
ওর ঠাকুরকে আমি বড় আগলে রেখেছি এখন
নির্ঘুম রাত গুলোয় তাঁকে জড়িয়ে ধরি

আর একটা মজার কথা 
গতকাল কাকিমা আমার ঘরে এসে বললো,
এ কী রে! তোর চোখ এমন মরুভূমি হলো কী করে?

বাবা বললো, না না আমি দেখেছি লুকিয়ে কাঁদে…
—–---–--------–––-
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

আত্মদীপ ভবঃ!

কালো মেঘের ঘনঘটা। মাথার উপর ঝুঁকে পড়ছে
বজ্র। আমি ভীষণ রকম আশ্রয় খুঁজছি
বন্ধ ঘরটার চারপাশে গিয়ে কেঁদে উঠলাম
আমাকে বাঁচাও! 

বৃষ্টি নেমে এল। আমার কান্না ভাসিয়ে নিয়ে গেল।
বিদ্যুতের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম 
ঘরের জানলা আধখোলা…
কাষ্ঠ হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বলছে, ভয় পেও না। আমি আছি।

এক বৃক্ষের নীচে আশ্রয় নিলাম। 
সে আমায় শ্বাস দিল। আমিও তাকে।
রাত্রি নেমে আসার আগে আমায় বললো,
আত্মদীপ ভবঃ!

আমি কৃতজ্ঞ হলাম সে বৃক্ষের কাছে।
সে বলল
'অত্তাহি অত্তনো নাথো কোহি নাথো পরসিয়।'
তুমিই তোমার ত্রাণ জেনে রাখো।

দুই হাতে অন্ধকার কেটে কেটে এগিয়ে গেলাম
পায়ে পায়ে কন্টক। গায়ে গায়ে অদৃষ্ট ব্যথা

কিছু পরে আমার চোখ জ্বলে উঠল।
অন্ধকার মাড়িয়ে আমি আরো দ্রুত এগোলাম।
কণ্টক ডিঙিয়ে, ব্যথা এড়িয়ে খুঁজে পেয়ে গেলাম
বিশাল আশ্রয় এক…

মাটির উপর বজ্রাসন। চোখ মুদিত।
অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামছে ধরায়।
বজ্র মুহুর্মুহু।

আমি বসে আছি নিভৃত নির্ভয়।
আমার শরীর… গা ভিজে নামছে বিস্ময়
মাঝে মধ্যে চোখ জানলা খুলে আত্মা দেখে নিচ্ছে
কেউ কি বাইরে আছে? চাইছে আশ্রয়?

ওকেও শিখিয়ে দেব আজ
আত্মদীপ ভবঃ! আত্মদীপ ভবঃ।
–––----------–––
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

'Dogs and natives are not allowed!'

'Dogs and natives are not allowed!'
ছিঁড়ে ফেলেছিলাম ওদের ক্লাবের দেওয়ালে টাঙানো এ নির্দেশিকা।
ভয় পাইনি এক বিন্দুও…
ওদের প্রমোদ ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছিলাম সেদিন।
নিজের জন্য নিজের কাছেই তো রেখেছিলাম স্পর্ধাকে।

কল্পনা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল আমায়, ছাগ বলি
দিতে পারিস, রাণী?
আমি হেসেছিলাম। না তা পারিনা। কিন্তু… 
চিবুক শক্ত করে বলেছিলাম, দেশের জন্য
মরতে ও মারতে দুইই পারি।

সমস্ত পটাশিয়াম সায়ানাইড মুখে ঢেলেছিলাম।
জয় হিন্দ! বন্দেমাতরম…
কেঁপে উঠেছিল ইউরোপীয়ান ক্লাব! প্রবল ইংরেজ।

আমিই তো সে!
বৈধব্যের নীতি অমান্য করে রামচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী
সেজেছিলাম। সন্ধান নিয়ে এসেছিলাম গোপন অস্ত্রের
আমার সারা অঙ্গে ঝাল লংকা ঘষছিল জমাদারনী
জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছিলাম আমি
চিৎকার করে বলেছিলাম, বলবো না! বলবো না!
পানিশমেন্ট সেলে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল
আমি জ্ঞান হারাচ্ছিলাম
তবু বলেই চলেছিলাম, বলবো না। বলছি না।
গোল্ডি আমার সঙ্গে প্রতারণা করলো!
আমার চোখে আগুন!
বুকে ঘৃণা
ক্রোধ দিলাম উগড়ে গোল্ডির গালে
ইতিহাসের পাতায় লিখে দিলাম
শোনো! আমার অন্য হাত বাকি এখনো
প্রয়োজন পড়লে…

অস্ত্র আইনে প্রথম যেদিন ধরা পড়ি আমি পুলিশের হাতে
সেদিন ওরা আমার প্রহরা এত শক্ত করে দিল
মনে মনে হাসলাম
নারীকে কারা যেন হীন দুর্বল ভাবে আজকেও?

প্রীতিলতা আমি! ননীবালা আমি! দুকড়িবালা,
কল্যাণী হয়েছি। আমি সুহাসিনী হয়েছি। 
বীণা, কল্পনা হয়েছি।

ওই দেখতে পাচ্ছ মিছিল? 
ভালো করে তাকিয়ে দেখো সামনে বুক চিতিয়ে
ভারতবর্ষ মাথায় নিয়ে এগিয়ে চলেছি আমি
আমি মাতঙ্গিনী! 
শুষ্ক ত্বক, জীর্ণ শরীর হলেও বুকে আমার জ্বলন্ত আগুন
ইতিহাস আমায় নাম দিল বীরাঙ্গনা।

এখন আকাশে ভাসছি আমি
পর্বতের শিখরে রেখে আসছি সাফল্য
বিজ্ঞানে জ্ঞান মিশিয়ে করে চলেছি আবিষ্কার
শিক্ষায় দীক্ষায় বৃক্ষ হয়ে উঠছি









কে ওখানে? ননী বালা দেবী?
এস পিসিমা, এস।
এক্ষুণি তোমার কথাই ভাবছিলাম। 
কী তেজ তোমার কণ্ঠে! ওহ! 
মনে পড়ে যায় সব গো
নির্দ্বিধায় অন্যের স্ত্রী হয়ে উঠলে
সারা শরীরে লংকার ঝাল মেখেও হেসে উঠলে
মাটির নিচে পানিশমেন্ট সেলের অত অত্যাচারেও 
বলে উঠলে, বলছি না। বলবো না।
গোল্ডির গালে দিলে চড়
আগুনের মত তেজ তোমার চোখে এখনো, পিসিমা?

ওই দেখো ঐদিকের তারাটাও জ্বলতে জ্বলতে
এদিকে আসছে। 
চিনতে পারছো তুমি? 
অস্ত্র আইনে প্রথম বন্দি স্বাধীনতা সংগ্রামী 
দুকড়ি বালা দেবী।
পিসিমা, ভালো আছো? 
সারাটা জীবন উৎসর্গ করলে দেশের জন্য
বলেছিলে, ছেলেরা পারলে মেয়েরা কেন নয়?
এ কী তোমার চোখেও জ্বলন্ত প্রতিবাদ যে দেখি এখনো!

কল্যাণী, বীণা, কল্পনা, সুহাসিনী সবাই এসেছ
ঘিরে ধরেছ আমার চারপাশ
আমি কি তবে ঘুমিয়ে ছিলাম এতদিন? 
তোমাদের এ আগুন আমায় স্পর্শ করেনি কেন? 
ওই তো… ওই তো লাঠি হাতে মিছিলের মুখে
মাতঙ্গিনী হাজরা

আমায় ডাকছে…
বলছে, প্রীতিলতা! ভারতবর্ষের মাটিতে এখন
স্বার্থ আর দ্বেষ
ভারতবর্ষের মেয়েরা এখনও কোথাও পড়ে পড়ে মরে।
ওদের শেখাতে হবে। 
ওদের মুষ্ঠি শক্ত করতে শেখাতে হবে
ওদের জাগাতে হবে।

হ্যাঁ হ্যাঁ তোমাদের সঙ্গে আমিও যাবো। 
জ্বালা মুখ হয়ে কীভাবে অন্যায়ে লাভার উদগীরণ 
ঘটাতে হয়, তা শিখিয়ে আসবো।

শুধু একটা মাস্টার দা খুঁজে আনা চাই! 
আর অন্যায়ের হাতে ধরা পড়ার আগে খানিকটা পটাশিয়াম সায়ানাইড…
–––– —------- ––––-
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

যেতে যেতে পথে…

'যেতে যেতে একলা পথে নিবেছে মোর বাতি।
ঝড় এসেছে, ওরে…'

আমার হৃদয়ে মরুর হাহাকার, বাইরে প্রবল প্লাবন।
পিতা,মাতা, ভ্রাতা, ঘর… সব নিয়েছে বিধ্বংসী সে ঝড়

শূন্য আঙিনায় আমি সেদিন একা।
আকাশের বিদ্যুৎ থেমে গেছে। 
অন্ধকারে ঝিল্লি ডেকে চলেছে এক টানা। 

পাড়ার জ্যেঠু, কাকু আমাকে আমার পরিবারের সঙ্গে কিছুতেই সহমরণে দিল না
সহ হরণে নিল।

তাদের শ্মশান খরচ, আনুসঙ্গিক অন্যান্য…
শরীরে ঝঞ্ঝা আমার আরও প্রবল
আঁচড় কামড় ঘা…

সব শেষে যখন রাত্রি গভীর, 
আমার ছিন্ন আঁচল লুটালো পাথর ছড়ানো পথে

সূর্য ওঠার আগেই একটা ছ ফুট বাই সাত ফুটের কামরায় রক্তাক্ত আমার গা চেটে দিয়ে গেল
সে পাড়ার কুকুর।

আমার দু চোখ স্থির হয়ে রইল। নির্ঘুম, নিঃস্বপ্ন।

এরপর প্রতিদিন রাত আসে।
ঠোঁটে রঙ বোলাই। হাতে তুলে ধরি কুপি।
একটা দুটো চারটে ছ'টা নরক তৈরি হয়
আমার বুকে, মুখে, গহনে।

একদিন আমার কামরায় থলি ভর্তি সৌরভ এল কোত্থেকে
আবেশে আকুল হলাম আমি।
জিজ্ঞেস করলাম, কে তুমি? এ গুলো কী এনেছ থলিতে?

তার হাতে ধরা আলো। আমার দিকে বাড়িয়ে দিল…

'সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি, লভিলে শুধু বঞ্চনা,
নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়
আমারে তুমি করিবে ত্রাণ, এ নহে মোর প্রার্থনা…'

আমার মত তোমারও বুঝি সব হারিয়েছে?
সে হেসে এক মুঠো চাঁপা আমার কোঁচড়ে দিয়ে 
চলে গেল। 
মিলিয়ে গেল নিমেষে।

এরপর সে প্রতিরাতেই আসতো। আমায় চাঁপা
দিত, আর দিত রবীন্দ্রনাথ…
'বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি, সে কি সহজ গান !'

শেষ যেদিন এসেছিল, সেদিন এ পাড়ার কুকুরগুলো
ওর ঘাড়, মাথা কামড়ে ধরেছিল।
স্পর্ধা অতিরিক্ত হয়ে গিয়েছিল সে ভিক্ষুকের।
ও রক্তে ভেজা শেষ চাঁপা দুটি কম্পিত হাতে 
আমায় দিয়ে বললো, 
'মোর মরণে তোমার হবে জয়।'

আমার দু চোখে আগুন জ্বলে উঠলো এইবার।
এক ভয়ংকর দাবানল! 
সব কটা কুকুরের সব দাঁত নিলাম উপড়ে
ছয় বাই সাত ঘরের দেওয়াল দিলাম ভেঙে
দুহাতে কুকুরগুলোর আর্তনাদ নিয়ে 
আমি ছুটে চললাম সকালের দিকে…

ছুটতে ছুটতে…
আরও চল্লিশ বছর কাটিয়ে দিলাম 

পাহাড়ের পাদদেশে এসে বসলাম। 
এখানে শান্তি বয়ে যায় কুলকুল শব্দে।
হরিণের বুকে মাথা রেখে হরিণী ঘাস ফুল গায়।
বুনো হাঁস তানপুরায় বাঁধে স্ত্রী হাঁসের মন

আমার সঙ্গে বেশ ভাব হয়েছে তাদের।
অরণ্য, নদী, পাখি সকলকেই বলে রেখেছি 
যেদিন প্রথম সকাল হবে, সূর্য উঠবে…
যেদিন আমার দু চোখে ঘুম নামবে…
সেদিন আমার পাশে রেখো একটি কেবল
'গীতবিতান'। 

আমার সে হৃদয় সহবাসী বিরহী আমার হাতে হাত
রাখবে। প্রসন্ন হবে। 
স্বপ্ন আঁকবে। 

রবীন্দ্রনাথ ছাড়া মৃত্যুই কী সহজ এত? 

'গীতবিতান' আর আমার কপালে প্রথম চুম্বন দেবে তার…
'কেটেছে একেলা বিরহের বেলা আকাশকুসুমচয়নে।'
—----------------––
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

বীরাঙ্গনার মা

'Dogs and natives are not allowed!'
ছিঁড়ে ফেলেছিল সে মেয়ে ওদের ক্লাবের দেওয়ালে টাঙানো এ নির্দেশিকা।
ভয় পায়নি এক বিন্দুও…
ওদের প্রমোদ ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছিল সেদিন।

কল্পনা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল তাকে, ছাগ বলি
দিতে পারিস, রাণী?
সে হেসেছিল। না তা পারিনা। কিন্তু… 
চিবুক শক্ত করে বলেছিল, দেশের জন্য
মরতে ও মারতে দুইই পারি।

সমস্ত পটাশিয়াম সায়ানাইড মুখে ঢেলেছিল সে মেয়ে।
জয় হিন্দ! বন্দেমাতরম…
তার কণ্ঠে কেঁপে উঠেছিল ইউরোপীয়ান ক্লাব! 
প্রবল ইংরেজ।

ওই তো ননী বালা দেবী
এক্ষুণি তার কথাই ভাবছিলাম আমি। 
কী তেজ ননীর কণ্ঠে! ওহ! 
মনে পড়ে যায় সব গো
নির্দ্বিধায় অন্যের স্ত্রী হয়ে উঠল সে
সারা শরীরে লংকার ঝাল মেখেও হেসে উঠল
মাটির নিচে পানিশমেন্ট সেলের অত অত্যাচারেও 
বলে উঠল, বলছি না। বলবো না।
গোল্ডির গালে দিল চড়

ওই আর একজন 
অস্ত্র আইনে প্রথম বন্দি স্বাধীনতা সংগ্রামী 
দুকড়ি বালা দেবী।
সারাটা জীবন উৎসর্গ করল সে
বলেছিল, ছেলেরা পারলে মেয়েরা কেন নয়?

কল্যাণী, বীণা, কল্পনা, সুহাসিনী আরো কত যে 
বজ্র আমার!

ওই তো… ওই তো লাঠি হাতে মিছিলের মুখে
মাতঙ্গিনী হাজরা
সারা শরীর রক্তে ভিজে তার, তবু পতাকা খানা
আগলে রেখেছে বুক দিয়ে…

আকাশে মাটিতে পর্বতে আমার মেয়েরা 
লিখছে নাম। গাইছে জয়গান
বিজ্ঞানে জ্ঞান মিশিয়ে করছে আবিষ্কার
গলায় স্টেথোস্কোপ নিয়ে হয়ে উঠছে 
আশীর্বাদ…
গর্বে আমার হৃদয় ভরে উঠছে।

তোমরা আমায় ভারতবর্ষ বলে ডাকলেও
আমি গলা উঁচিয়ে বুক ফুলিয়ে বলি,
ওরে! আমি শুধু ভারতবর্ষ নই রে
তোরা শোন! 
আমি শত শত লক্ষ লক্ষ বীরাঙ্গনার মা
আমি বীরাঙ্গনার মা

তবুও আজ বড় স্বার্থের কষাঘাত
দ্বেষ হিংস্র হয়ে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে উঠছে
হানাহানি, দাঙ্গা…
কখনো মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে কান্নারা
ছিন্ন ভিন্ন প্রাণ ছটফট করে মাটিতে!

ঠিক তখন আবার আমার প্রসব বেদনা উঠতে চায়
আমার গর্ভ জন্ম দিতে চায় ঝাঁসির রাণী, প্রীতিলতাদের…
আমি যে কেবল ভারতবর্ষ নয়, আমি বীরাঙ্গনার মা হতে চাই!
বারবার…
বারবার…
—-----------–––
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

নিজের গড়

এই মনে করো একমুঠো ছাই
উড়িয়ে দিও। ভাসিয়ে দিও।
অমূল্য কিছু না পেলেও ছাই দূর হয়ে
সে স্থান হয়ে উঠবে উজ্জ্বল। 
চারিদিকে দেওয়াল দেবে বাতাস
রোদ্দুর পড়ে সেখান সোনার মত চকচক করবে।
তুমি তার নাম রাখতে পারো, সোনার সর।

যদি পদ্মের পাতায় টলমল করে জল
তুমি তা বেঁধে দিও তোমার দুহাতের প্রহরায়।
সে জল মুক্তা না হলেও তোমার তৃষ্ণায় 
এক বিন্দু শান্তি হতে পারে। 
তুমি তার নাম রাখতে পারো, প্রাণের ঘর।

প্রতিটি ধূলিকণা মেঘ হতে পারে
বৃষ্টি হয়ে তোমার স্নান হতে পারে
মাছরাঙা রঙ নিয়ে এসে তোমায় বন্ধু করতে পারে
কলমি লতায় লুটিয়ে পড়তে পারে আলো
তোমার উঠানে খেলতে আসতে পারে
চড়াই, শালিক, পায়রা।
তুমি তাদের কথা বুঝতে না পারো
কিন্তু তারা তোমার গান হতে পারে স্বচ্ছন্দ্যে।
তুমি তোমার উঠানকে ডাকতে পারো, আনন্দ-বর।

এই মনে করো, বিষাদ বড়, দুঃখ যাপন
তোমার জন্য পথ নেই, রথ নেই।
শোককে খুব ধুইয়ে দাও।
মন থেকে চোখ, চোখ থেকে গাল
গাল থেকে খুলে রাখো বাষ্পে…
ভালোবাসো, ভালোবাসো, ভালোবাসো।
তুমি তোমার ফোলা ফোলা দু চোখের নিচে
হাসি রেখে তার নাম রাখতে পারো, নিজের গড়।

নিজেই নিজেকে জড়িয়ে ধরো।
নিজের সামনে জ্বালো আলো।
নিজের গড়ে নিজেই রাজা, নিজেই প্রজা
যুদ্ধ এলে সাজাও ক্ষেত্র হৃদয় ময়দানে

তারপর সন্ধি করো। ভালোবাসা ঢালো। 
তারপর সন্ধি করো। ভালোবাসা ঢালো।
—--------------–----–––
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

সত্য সুন্দর

"Beauty is truth, truth beauty,that is all
Ye know on earth, and all ye need to know.”

বিড়বিড় করে কথা কটি বলেই চোখ বন্ধ হল নিরূপমার। 
সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়েই আচমকা পা পিছলেছে সে,
বাড়ির সম্মান পিছলানোর সামান্য আগেই।

সিঁড়িতে তেল ঢেলে রেখেছিল আমার কাকীমা।

দু বছর ধরে তারা অনেক সহ্য করেছে যে!

আমার মৃত্যুর আগের দিন নিরূপমার হাত
নিয়েছিলাম আমার হাতে।
বলেছিলাম, আমি তো যাবো অসুখে। ভেবো
চাকরি সূত্রে বিদেশ, তোমারও হবে প্রমোশন
সময় এলেই…
নিরূপমা হেসেছিল। আমি বলেছিলাম, এই তো চাই!

আমার মৃত্যুর দিন ও দ্বার রূদ্ধ করে রবীন্দ্রনাথ গেয়েছিল।
বৃষ্টিতে ভেজেনি। 

পাড়ার লোকে যৌথ পরিবারের দিকে তর্জনী
তুলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিল, হায় হায়! শেষ হবে
এইবার বাড়ি এ অলক্ষ্মীর জন্য…

বছর চল্লিশের নিরূপমা আমার। 
বলে এসেছিলাম, 
আমার পরের জন্মদিনেও তোমার সাজ কিন্তু চাই!

ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, চোখে কাজল, লাল শাড়ি
সে হেসেছিল, প্রমোশন তাতে দ্রুত হবে বুঝি?

নিরূপমার এলো চুল। কম্পিত ঠোঁট। চোখে গান।

সোনার তরী হাতের ভাঁজে। 
আকাশে মেঘের হুলুস্থুল
পাড়ায় উষ্ণ আলোচনা

আমি বলে এসেছিলাম তাকে, সত্যকে সহজে নিও।

সিঁড়িতে তেল ঢেলেছিল কাকীমা। 

নিরূপমা বড় বাড় বেড়েছিল।
বৈধব্যের নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করছিল প্রতি মুহূর্তে
সাদা শাড়ি সরিয়ে রেখে পরছিল সে আমার
পছন্দের মাছরাঙা রং, গোধূলি রঙ।

নিরূপমার সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
তার নিজ হাতে তৈরি বাগান সৌরভ পাঠিয়ে
বারেবারে দেখে যাচ্ছে তাকে।
মনমরা প্রজাপতি, ফিঙে। 

মৃত্যু, বিজয় গর্ব কোরো না। এ আমার প্রমোশন।
তার বিড়বিড় শুনল হলুদ রোদ্দুর, মাধবীলতা আর আমি।
ঝমঝম করে নামলো বৃষ্টি। 
আমার হাওয়া শরীর খুব ভিজলো, খুব!

মৃত্যুর পরে নিরূপমার ঘুম ভাঙেনি এখনো।
ভাঙলে ওকে বলবো, এই ভালো। ধুলোয় ধুলো
হয়ে দুজনে সংসার করবো কেমন!

কিন্তু ওকে না বলে আমার উপন্যাসের উপসংহারে চুপিচুপি একটা কথা লিখে রাখবো,

নিরূপমারা মরেই যায়। কেউ পণের দায়ে, কেউ 
কলঙ্ক গায়ে…

তারপর ভুলে যাবো সব। 
নিরূপমা জেগে উঠলে দুজনে মিলিত উচ্চারণ করবো…
"Beauty is truth, truth beauty…"
—----------------------
SUJAN MITHI (SUATA MISHRA)