'অমৃতস্য পুত্রা…'

ঊষর ক্ষেতের পাশে শুষ্ক শরীরে শুয়ে পাগলিনী
প্রলাপে মত্ত।
দিগম্বরী সাজ তার। শয়ে শয়ে পিঁপড়ে তাকে ঘিরে।

গৃহস্থ বাড়ির বধুটি এ পাড়ায় আসছিল শিশু খুঁজতে তার…
বিস্মিত চোখে দেখল, ঊষর ক্ষেতের ঠিক মাঝামাঝি
এক খানা বৃষ্টির মেঘ ঝুলে আছে…
কচি চারা উঁকি দিয়ে আছে তার শিশুটির মত।

পাগলিনী র কাছে গিয়ে দেখে,
কেউ তাকে করেনি প্রসূতি
কেউ দেয় নি কালশিটে ক্ষত…
শুষ্ক ত্বকের নিচে এখনো লুকিয়ে ঘর
চোখের ভিতরে স্মৃতি…

বধূটি বাড়ি নিয়ে ফেরে শিশু আর পাগলিনী একসাথে
স্নান করিয়ে শাড়ি পরিয়ে আয়না রাখে তার সামনে

শিশুটি দেখতে পায় সে আয়নায় স্বপ্ন ফুটে উঠেছে
এক সুন্দর…
বৃষ্টি পড়ছে
ঊষর ক্ষেতে গান গেয়ে গেয়ে শ্রাবণ বুনছে কৃষক।
—-------------------
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

আমরা যখন

আমরা যখন একসঙ্গে থাকি
সকাল কেটে নদী মাঠের বেলা
মেঘ রোদ্দুর আঁকি
ময়ূর ময়ূর করতে লাগি খেলা!

আমরা যখন একসঙ্গে থাকি
গা ধোয়ানো সুখ আছড়ে পড়ে
ভালোবেসে মাখি
আমাদের সেই একলা হওয়ার ঘরে…

আমি তার চুল ভিজিয়ে বলি
দূর নয় তো দূরে!
একটা ছোট্ট গলি
তারপরেতেই বাঁধা আমরা সুরে

ছুঁয়ে আসি বৃষ্টি বৃষ্টি ঘাট
চুমো নামের ঢেউ
আমাদের সেই মাতাল হাওয়ার মাঠ
যেখানে আর যায় না কেউ!

কেবল একটা কথা আঁকি
আমরা যখন একসঙ্গে থাকি
কোয়েল তিতির বাবুই শ্যামা ডাকি
ভালোবেসে ভালোবাসা মাখি…

পাহাড় থেকে ঝর্ণা গড়ায় খুব
আমি তাকে জড়িয়ে থাকি
একসঙ্গে বিরহে দিই ডুব
আমি তাকে কবিতা বলে ডাকি।
—--------------------
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

ভালোবাসা

আধো ঘুম তখন তার, 
বললাম, করো হাঁ…
গ্রাস মুখে নিয়েই সে বলল, ভালোবাসো?

আলুথালু মুখ। হলুদ গুঁড়ো আর স্নেহ মেশানো আঁচল
বললাম, বিকেলে সিনেমার টিকিট কাটলাম,
তৈরি থেকো।

হলের ভিতরে ওর কানের কাছে মুখ নামিয়ে
জিজ্ঞেস করলাম, ভালোবাসো?

মায়ের চুল বাঁধছিল সেদিন।
ফুল ফুটেছিল আগেই
কবরীতে করবী এনে দিল গুঁজে
আমি পাশে এসে দাঁড়াতেই আমার দিকে হাত বাড়ালো।
মা হেসে উঠল। বলল, হ্যাঁ রে! বিয়ে কত বছরের হল
তোদের? পুরানো হয় না বুঝি আদর?
তার তিরতির করে ওঠা ঠোঁট বলল, পনের মা।

রাত্রে সে ভীষণ করল রাগ!
দৃষ্টিতে নিশ্চুপ।
বুকের মধ্যে মুখটা নিয়ে তখন খুব বলছি আমি
ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি
সে বলছে, চলবে না এ! 
বিদেশ তোমায় যেতেই হবে! 

অনেক বড় প্রমোশন আমার 
সে থাকবে অপেক্ষায় এমনই কথা
ভালোবাসাও থাকবে বিলক্ষণ
কিন্তু আমি না বলাতেই রাগ তার খুব…

চোখে তার জল দেখেছি।
প্রশ্ন রেখেছি আলিঙ্গনে, তবে দিতে চাও কেন যেতে?

শেষে টিকিটখানা দিলাম ছুঁড়ে ফেলে।
মা বলল, বেশ করেছিস।
সে হেসে বলল,
এমন বোকা আর কেউ থাকে?

বাহুর ঘরে তাকে টেনে নিই। 
বলি, ভালোবাসা বেঁধে যে রাখে!
—-----------––
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

গান রাখলাম চুম্বনে

শ্যাম - 'ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে
আমার নামটি লিখো-- তোমার
মনের মন্দিরে।
আমার পরানে যে গান বাজিছে তাহার তালটি শিখো-- তোমার চরণমঞ্জীরে॥'

আহা রাই আমার! চরণে এত শোণিত? 
এই অভিসারে আমার যে গো হৃদয়ে বড় ক্ষত!

রাই - অশ্রু কেন চোখে তোমার প্রিয়? প্রেমে কি গো এত ব্যথা লাগে? এইটুকু ক্ষত এ আমার বড় আনন্দের! 

শ্যাম - দাও দাও পা দুখানি! কোলে তুলে আদর দিই, যত্ন দিই। 

রাই - ইস! প্রাণ আমার! তার চেয়ে বাঁশিতে তোলো মেঘ মল্লার…ঝমঝম করে বৃষ্টি আসুক। আমরা দুজন একসঙ্গে ভালোবাসতে বাসতে ভেসে যাই শ্রাবন দেশের ঘাটে। শুধিয়ে আসি সুধার পুকুর ঘাটে, তোমরা কি কেউ ভালোবাসতে পারো, আমার শ্যামের মত?

শ্যাম - গোকুল যে ছাড়তে হবে আমায়! মথুরা গমনের সময় হয়েছে। তোমার জন্য একটা গান বেঁধেছি। সেইটে তোমার মর্মে দেব ঢেলে। আমায় মনে পড়লে শুনো তাকে। আগল দিয়ে রেখো। শরীর মন সবটুকু বন্ধ করে যত্ন দিয়ে…

রাই - এমন করে বোলো না সখা! তোমায় ছাড়া কেমন করে থাকবো তবে প্রিয়? শাশুড়ি ননদ কাঁটা বিছায় পথে, স্বামী মুখ ভার করে…তবু ছুটে ছুটে আসি। তোমায় ছেড়ে থাকবো কেমন করে?

শ্যাম - প্রেমে বিরহ যে অবশ্যম্ভাবী প্রিয়ে! আমার গান খানি হৃদয়ে রেখো। তোমার যখনই মনখারাপ হবে, নিজের বুকে হাত দিয়ে আমায় ছুঁয়ে নিও।

রাই - কেমন করে আমার বুকে তোমায় পাবো?

শ্যাম - ভালোবাসলে শরীর জুড়ে যায় মনের সঙ্গে। মন শরীরে। দূরত্ব যতই সুদূর হোক, আশায় বাসা গড়ে তোলে ভালোবাসা ঠিক বুকের মাঝখানে। আমি যেমন তোমায় ছোঁবো অনুভবে, তেমনই তুমিও আমায় পাবে।

রাই - যেও না কানাই!

শ্যাম - এই তো উচিত তোমার দেবী? এত স্বার্থপর তো নয় ভালোবাসা! আঁচল খুলে দাও…

রাই - ‘‘জনম অবধি হাম রূপ নেহারিলু—
নয়ন না তিরপিত ভেল।
লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখলু
তবু হিয়া জুড়ন না গেল।"

যাও তবে। ফিরে এস ঠিক। যদি এক পৃথিবী বদল হয়ে যায়…যদি সহস্র বছর পার হয়ে যায়…যদি মেঘ রোদ সুর নতুন হয়ে যায়…ফিরে এসে আমার বুকে তোমার গান খানিকে ঠিক খুঁজে পাবে। 
আমার শরীরে তোমার ঘ্রাণ…
আমার কিন্তু মৃত্যু হবে না কানু!
সাবধানে এস…

শ্যাম - বিদায় দাও। কর্তব্য শেষ করেই ফিরে আসবো আমাদের এই হৃদয় পুরের বাসায়।
দেখো, বৃষ্টি নামলো।
এই গান রাখলাম চুম্বনে…
—-----------––
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

বিজয়া

অতি স্নেহে বাবা নাম রেখেছিলেন আগমনী।
মাস তিনেক পরেই বাবা মায়ের গাড়ি দুর্ঘটনায়
মৃত্যু…
আমার নাম হয়ে যায় অভাগী।

আমার বুদ্ধি হালকা ছিল। শরীর ছিল ভারী।
জেঠি মারতে মারতে হাত ব্যথা করে ছেড়ে দিয়ে
বলত, আবাগী মরে না বাপু! 

বই পত্তর ছুঁয়েও দেখিনি কোনোদিন
দেখিনি কেমন করে ভালোবাসা হয়
ছোটকার বন্ধু এসে আমার গালে টোকা দিয়ে
বলত, কী খুকু কেমন আছো?
বেশ লাগত আমার।

আমার বুদ্ধি বড় হালকা। কিন্তু হৃদয় ছিল ভারী।
কেঁপে কেঁপে উঠত সেই টোকায়।

রোজ রোজ এমন চলতে চলতে আমার শরীরে
গজিয়ে উঠল জেঠির সঙ্গে দেখতে যাওয়া
যাত্রা পালা…
একদিন ফাঁকা বুদ্ধির ঘরে কী এক বিস্ময়
প্রবেশ করল। কী এক আনন্দ…
জাপটে ধরে আঁচড়ে কামড়ে ভালোবেসে ভেসে
গেলাম। 
ছোটকার বন্ধু সেদিন আমার গালে স্নেহ রাখতে আসার সুযোগ পেয়ে
আর তাকে ছাড়িনি…

হালকা বুদ্ধি বলে কি শরীর বড় হতে নেই?
ছোটকা মাথায় ছুঁড়ল চ্যালা কাঠ…
জ্যাঠা বলল, বাড়ির কলঙ্ক। 
আজ দশমী। বিজয়ায় বিজয় করে দিয়ে আয়।

এসব অনেক জন্ম আগের কথা।
এখন আমি মাটি।
ছোটকার বন্ধু কুমোরটুলি।
আমায় গড়ে।
আগমনী থেকে বিজয়া হই।
আবার জলে ভেসে ভেসে ফিরে আসি কুমোরটুলিতে।

সব ভালোবাসা কী আর প্রতি জন্মে রক্ত মাংসে হয়?
—-------–------–––
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

বকুল বৈরাগী

এই বুঝি গনতন্ত্র? 
বকুল বৈরাগীর স্পর্ধা বড়! 
যেখানে দেওয়ালের ও কান থাকে, ও সেখানে
বাতাসে বাতাসে তুললো প্রশ্ন?
 
প্রশ্ন গিয়ে পৌঁছালো সরকারি দপ্তরে
তার আগে সুন্দরী বান্ধবীর মর্মে
এমন করে বলে কে বা? 
এতটুকুও বিবেচনা নাই? 
আমি বলে সামান্য এক নারী…
যদিও বস্তা ভরে কিছু কেমন টাকা রাখতে পারি

বকুল বৈরাগী চিৎকার করে উঠল
আমার ছেলেটা পাস করে বসেছিল
চাকরি হবে! চাকরি হবে!
একদিন মরে গেল…
শালা এই বুঝি গনতন্ত্র? 

বকুলের পাশে এসে দাঁড়ালো আরো ক্লান্ত মুখ
ক্ষুধার্ত চোখ। জিজ্ঞেস করলো, শাস্তি হবে না?

বৈরাগী উত্তর দিল, 
ওদের জন্য হাসপাতাল আছে
শাস্তি নেই…
প্রজন্মের পর প্রজন্ম হাঁ করে তোরা দাঁড়িয়ে থাক
খাবি খা
হাতে রইল হ্যারিকেন…

মন্ত্রীর সুন্দরীরা ছুটে এল বকুল বৈরাগীর কাছে
ছুটে পালিয়ে গেল পাশে দাঁড়ানো মুখ গুলো
ছো! তোর তো দেখি একটা জামাও নেই!
বকুলের গায়ে থুথু ছুড়লো সুন্দরীর নিরাপত্তারক্ষী

বকুল আকাশ ফাটিয়ে বলে উঠল,
জামা নেই, জুতো নেই, ঘর নেই, 
আমার শুধু একটা আস্ত শির দাঁড়া আছে।

ক দিন পরে সব ঠান্ডা।
সব স্রোত মিলিয়ে গেল।
মন্ত্রী আবার পেট ফুলিয়ে টাক ডুমাডুম 

শুধু বকুলকে আর পাওয়া গেল না ।
—---------–––
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

'কালো? তা সে…'

আমি সেই বাইশে শ্রাবণ চাই।
ঘাসের উপর নেমে আসবে মেঘ
গাছে গাছে বাতাস শুয়ে শোক রাখবে
গাছেরা নুয়ে পড়বে মাটিতে
কচি ধান গল্প বুনতে বুনতে কান্নায় ভাঙতে চাইবে
মনকেমনের পরাজয় গাঁথবে বিরহী…

চোখে কাজল এঁকে আমি দাঁড়াবো তাঁর কাছে।
তিনি মৃত্যু থেকে উঠে এসে আমার দিকে
তাকাবেন…
বলবেন, ' কালো? তা সে যতই কালো হোক… '

কালো বিড়ালটা রোজ মাছ খেয়ে যেত লুকিয়ে
শাশুড়ি মা খুন্তি ছোঁড়েন, ঘটি বাটি…
মর মর মর! 
দিন সাতেক হল বিড়াল টা আর আসেনা
কালো বউ দুপুরবেলা একটা উপন্যাস হয়ে যায়
শাশুড়ি মা ননদের সঙ্গে অ-সুখ ঢালেন তাতে
কালো বউ চুল ভিজিয়ে নেয় সে খটখটে দুপুরের
অ-সুখে…
তারপর স্বপ্ন দেখে।
আমি কি প্রবল স্বপ্ন দেখি!…

আমার একটা ঝর্ণা থাকবে
গা ডুবিয়ে তিরতিরে স্রোত হব আমি।
আমার একটা পাখি থাকবে
রং চুবিয়ে তাকেই রেখে যাবো সাদা ক্যানভাসে
আমার একটাই কবিতা থাকবে
'কালো? তা সে যতই কালো হোক…'

ময়না পাড়ার মাঠে দেখেছিলাম একদিন
একজন বেশ তাকাতো আমার দিকে
কিছুক্ষণ পরে তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম
তুমিই কি সেই? তুমিই কি মেঘলা দিনের কবি? 
সে খুব হেসেছিল। বলেছিল, 
আমি সিধু কানহু তো নই যে সাঁওতাল পরগনা 
লিখবো! 

আমি সেই শ্রাবন চাই
সেই বাইশ…
সকাল থেকে অবিরাম বৃষ্টি পড়বে!
মন কেমন দিকে দিকে মেলবে শাখা
মেঘ আরো ঘন হবে 
আরো ঘন

তার থেকেও ঘন হয়ে উঠবে আমার চোখের কাজল
কবি মৃত্যু ছেড়ে উঠে বসবেন
আমার কানের কাছে মুখ রেখে বলবেন,
 'কালো? তা সে যতই কালো হোক…'

মিশকালো বিড়াল টা সত্যিই আর কখনো আসেনি।
—-------------------
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)