বাহামণি বাস্কে

মেয়েটার নাম বাহামণি বাস্কে।
বসন্তের বাহা-মেলায় যখন ওর বাপ ঠাকুর্দায় 
নাচকোঁদ করছিল ঠিক তখন পাড়ার বুড়ি দাই এসে
খবর দিয়েছিল, অ বুধনা! শিগগির যা! দেখ গে
তোর চাঁদ পানা বেটি হয়েছে রে!

সে তার বাপের কী খুশি যে হল! একেবারে এক ছুটে 
ঘরে গিয়ে মেয়ে কোলে তুলে বললে, 
আমার বাহামণি আইছিস? 
ঠাকুরদা বললে, মারাং বুরুর থানে পুজো রেখে আয়
বাপ…পত্তম মেয়ে লক্ষ্মী হয়। 

এই বাহা যখন স্কুলের পরীক্ষায় প্রথম হল
অন্য সব অভিভাবকেরা হামলে পড়ল স্কুলের গেটে
কারা আবার শ্লোগান তুললো ওর মধ্যেই…
বিচার চাই! বিচার চাই! 

বাহার বাপের বুক ঢিপঢিপ
মেয়ের কানের কাছে মুখ নামিয়ে জিজ্ঞেস করলে,
হ্যাঁ রে মা! কিছু করিস নাই তো? 
বাহামণি হেসে বললো, করেছি তো বাপ!
বড়লোকদের ছিটকাই দিছি!

অনেক অনেক বার খাতা মিলিয়ে মিলিয়ে বাহামণির
পাওয়া নম্বর একটাও কমলো না। 
বরং বাংলায় সুন্দর হস্তাক্ষরের জন্য বরাদ্দ এক নম্বরটাও জুটে গেল তার। 
যারা বিচার চাইতে এসেছিল, পাংশু মুখ করে বললো
এত সুন্দর হাতের লেখা! কী করে হয়? 

তরতর করে এগোয় মেয়ে। 
বাহা উৎসবে বসন্ত নামে। মা বাপের সঙ্গে গিয়ে
নাচন কোদন করে। পান্তা খায়। 
মারাং বুরুর সামনে মাথা নোয়ায়।
খড় কাটে। গরুকে জাবনা দেয়।
বিকেলবেলা গা ধোয়, পাউডার লাগায়
বুধি, কমলি দের সঙ্গে গল্প করে…

রাত নামলে ডুবে যায় বইয়ে।
এক প্রবল আত্মবিশ্বাসে।

মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ছাড়িয়ে মেয়ে সাড়া ফেলে দিল হঠাৎ একদিন
হই হই কান্ড রই রই ব্যাপার…

বাহামণি বাস্কে মেডিকেলে পেয়েছে চান্স!

ওই যে যারা বিচার চাইতে এসেছিল
তারা আড়ালে হাসলো, বললো…
বোঝো না! সংরক্ষণ! নাহ! এ দেশের ভাগ্যে আর
ভালো কিস্যু হবে না!
ও যদি ডাক্তার হয়, মরবে! সব মরবে।

বাহামণি ডাক্তার হল। কিন্তু তার কাছে চিকিৎসা
নিতে এলো না কেউ…

বাহামণি গলায় স্টেথোস্কোপ নিয়ে সাঁওতাল পরগনার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালো।

বাদল মুর্মু, টগরী টুডু, লম্বু হেমব্রম, লক্ষী, রতন, 
সোনালী সবাই একে একে এলো তার কাছে
বাহা…পেটে বড় বেদনা!
বাহা…বুকের বাঁ দিকে কী যে হয়! এতদিন মারাং বুরুর চন্নামেত্ত খেলুম, তাও…
বাহা…ভাগ্যিস তুই ছিলিস! 
বাহা…তোর অনেক ভালো হোক বেটি!

বাহামণি আরো ডিগ্রি অর্জন করলো। বিখ্যাত 
কার্ডিওলোজিস্ট বাহামণি বাস্কে পুরস্কৃত হল
দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে…

ওই যে যারা বিচার চাইতে এসেছিল, তাদের
বুকের রোগ নিয়ে এ ডাক্তার ও ডাক্তার করতে
করতে শেষে শুনলো, বাহামণি বাস্কেই শেষ উপায়।

বাড়ির লোককে বললো, আর কী! 
সব ডাক্তারই ওর কাছে রেফার করছে যখন…

ভদ্র পাড়া ধীরে ধীরে ভিড় জমালো 
সাঁওতাল পরগনায়।

বসন্তের বাহা উৎসব তখন খুব।
বাহামণি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নাচছে, গাইছে।

ওর বাপ বললে, যা বেটি যা! ওদের বুক কেটে
ধুকপুক টা বের করে দিয়ে আয় আরো…
ওরা বেঁচে থাকলে তবে না আমার ঘরে বাহামণি জন্মাইবে!

বাহামণি টেবিলে শুয়ে থাকা ভদ্রলোকগুলোর
বুক কাটে, হৃদয় হাতে নিয়ে দেখে…
ঠিক কোনখানে লেখা থাকে, 

বাহামণি বাস্কে প্রথম হতে পারে না!
বাহামণি বাস্কে ডাক্তার হতে পারে না!
বাহামণি বাস্কে আগুন হতে পারে না!
বিচার চাই! বিচার চাই!
—----------–--
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

ওরে আমার নরম সবুজ প্রাণ

এ লেখায় মনের ভিতরের খানিক কষ্ট উগরে দিলাম

ওরে আমার নরম সবুজ প্রাণ
ওরে আমার অবুঝ আবেগ গান

তোদের বুকে পাঁজরের নীচে কেবল কি প্রেম লুকিয়েই থাকে? ভালোবাসিস তাকে? সে তোকে বাসে না বুঝি? পেয়েছিস উত্তর সোজাসুজি? তাইতে তোর মৃত্যু চাই? হ্যাঁ রে! তোর কি অন্য আপন নাই?

তুই যখন তোর মায়ের গর্ভে, জননী হওয়ার সে পর্বে তোর মায়ের সে যন্ত্রণার হাসি। চুমো দিয়ে তোকে বলেছিল ভালোবাসি…কই মরার সময় তাকে রেখেছিলি মনে? বাবা? ভুলে গেছিস? আর এক আপন জনে? বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন আর…
দুয়ো! বীর তুই! পরে মৃত্যুহার?

শোন রে শোন! যার জন্য মরণ নিলি, কষ্ট নিলি
তাকেই বরং আরো খানিক বাঁচতে দিয়ে গেলি।

ভুলে যাবে…ভুলে যাবে তোকে মাটি গাছ পাখি
কারো জন্য আটকে থাকে কিছু? পড়ে থাকে বাকি?

মনের দুঃখে হতাশ তুই, ইচ্ছে করছে মৃত্যু ছুঁই?
জীবন বৃথা ছাড়া তাকে…ওরে উন্মাদ! মস্ত বিশ্ব
তোর জন্যও থাকে। ঠিক সময়ে তাকেই পাবি
ভালবাসায় ভেসে যাবি…তোর জন্যও সে আছে!
তোকে বাঁচিয়ে যে নিজে বাঁচে।

যার জন্য মরলি তুই! নিজের দায়ে হারালি ভুঁই।

ইচ্ছে করে ফিরিয়ে আনি তোকে। বসিয়ে দিই একলা মায়ের শোকে।

যাক গে যাক। ভালো আছিস করি আশা। নিশ্চই পেয়েও গেছিস ভালোবাসা… নইলে কি আর যেতিস মরে? বিনা স্বার্থে কে আর এমন করে? 

আর যদি নিতান্তই অসুখী হোস। আমার লেখার পাশে চুপটি করে বোস। 

এখনো যারা ভাবছে তোকে দেখে, ঝুলতে চায় প্রেম খেলাতে ঠেকে… তাদের জন্য উঠিস ঝড়! বলিস, মরতে চাইলে নিজের জন্য মর! এক পৃথিবী মাটি আছে, স্বান্তনাটাও মায়ের কাছে। অপেক্ষাতে বাবা থাকে, মনের মধ্যে স্বপ্ন আঁকে। 

মরলি? তবে ফুরিয়ে গেলি! ভালোবাসা আর কি পেলি? 

দুয়ো তোকে! তুচ্ছ শোকে মৃত্যু চাস? 
দাঁড়া পাশে…যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হা হুতাশ!
ঘুমিয়ে শিশু খিদের চোটে, মুহুর্মুহু কান্না জোটে। মৃত্যু তাদের পায় না কই? অভাব কাঁধে জীবন চষে…মাভৈ! 

যে সময়ে খুব হারবি! তাকেই ভীষণ ধার ধারবি! মনে হবে আর তো নয় মোটে! ঠিক সে সময়ে ভাববি এদের। দেখিস তোর বুকেতে কেমন করে বেঁচে থাকা ফোটে।

বাঁচবি ওরে প্রাণ! বিলিয়ে স্নেহ দিবি ! দিন ফুরালে কত শত ভালোবাসা নিবি? 

কারোর জন্য মরতে হলে…জেনে রাখিস ওরে
ভুলে যাবে বিশ্ব তোকে। নতুন সূর্য উঠবে ঠিকই ভোরে।

তোকে ছাড়াই নতুন সূর্য উঠবে ঠিকই ভোরে।
তুই যে ছিলি। ভুলবে লোকে। যাবিই যাবি মরে।
—------------––-
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

একমাত্র ভালোবেসেই…

কাকু বাবার দূর সম্পর্কের ভাই।
আমি তাকে স্বপ্ন কাকু বলেই ডাকতাম।
আমাদের বাড়িতে এলে প্রতিবার মাসখানেক থেকেই যেত স্বপ্নকাকু।
বাবা মাকে বলতো, আহা! তিনকুলে কেউ নেই এই আমি ছাড়া…কোথায় আর যাবে?

স্বপ্ন কাকু ভালো ছবি আঁকতে পারত। ক্যানভাসে
আর মনে।
বাড়িতে ঢুকেই ছবি আঁকার জিনিসপত্র সোফার উপর রেখে আমার কাঁধে হাত রাখত,
কী খুকি! আছো কেমন?

বারো বছরের কিশোরীকে খুকি বলা নিয়ে
গাল ফুলিয়েছি বহুবার
তবু কাকু আমায় ওই নামেই ডাকত।
সন্ধে হলে দেশ বিদেশের গল্প শোনাতো। 
চুলে বিলি কেটে দিত।
মা ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ দিয়ে যেতে যেতে বলত
ঠাকুরপো! তুমি পারোও বটে! 
আমার এমন চঞ্চল মেয়ে তোমার গল্পে একেবারে চুপ! 

স্বপ্ন কাকু আমার ব্যাগের মধ্যে একটা ব্যাং এঁকে
ঢুকিয়ে রেখেছিল।
স্কুলে গিয়ে আমি ব্যাগ খুলতেই দেখি তাতে লেখা
খুকিকে…স্বপ্ন কাকু!

আমি বাড়ি ফিরে কাকুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
কাকুর বুকে আমার বুক
দুই হাতের মধ্যে আমার মুখ
তিরতিরে ঠোঁট…
তখন আমি বারো পেরিয়ে তের
তের পেরিয়ে চোদ্দ

ব্যাঙের ছবিটার নীচে লিখে রাখলাম
স্বপ্ন কাকু তোমায় ভালোবাসি।

সেবার যখন কাকু এলো আমাদের বাড়ি
আমি খুব ধরে পড়লাম তাকে,
আমাকে তোমায় আঁকতেই হবে কাকু!

কাকু অনেক ভেবে বললো, আঁকতে পারি
শর্ত আছে। সম্পূর্ণ হওয়ার আগে অবধি দেখতে
পারবে না।
তাই সই।

আমি শাড়ি পরেছি। চোখে কাজল দিয়েছি। 
চুলে খোঁপা। রাতের রজনীগন্ধা তাতে।
গোটা ঘর ম ম করছে গন্ধে।
স্বপ্ন কাকুর মন পড়ার চেষ্টা করছি আমি।

মুখ আঁকার শেষে কাকু বললো, 
এবার গলা, গলা বেয়ে
বুক…

আমি বুক থেকে শাড়িটা খানিক নামিয়ে দিলাম নিচে
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ভাঁজ। 
আলোড়ন কি কাকুর ভ্রুতে?

শান্ত কণ্ঠে কানে ভেসে এল সুর
যা নিভৃতে সুন্দর, তাকে রাখো অন্তঃপুরে।

দিন কয়েক পরে চুপিচুপি আমি স্বপ্নকাকুর ঘরে ঢুকি। 
বাক্স প্যাটরা হাতরাই। যদি আমার কথা কিছু 
লিখে রাখে তার নিত্য লেখা ডায়েরিতে!

এক গোছা চিঠি আলগোছে পড়ে যায় আমার হাতের
উপর…

প্রিয়তম,
     তোমার দেওয়া নামই রাখলাম শেষে। অনিরুদ্ধ। দেখতে হুবহু তুমি। 

প্রিয়তম,
      এবার বড় তাড়াতাড়ি চলে গেলে। তোমার ছেলেটি যে তোমার মতই শিল্পী হয়ে উঠছে, তা দেখে গেলে না!

প্রিয়তম,
       তোমার সবচেয়ে প্রিয় আমার বুকের অতন্দ্র প্রহরী স্তন দুটোয় মারাত্মক অসুখ বাসা বেঁধেছে। ডাক্তার বলেছে বাদ না দিলে…

কই তুমি তো আর এলে না? স্তন বাদ গেছে বলে কি? শরীর ছাড়া আমার কোনো মূল্য নেই তোমার কাছে?

একবার এস! ছেলেটাকে নিয়ে আমার স্বামী আমায় ফেলে চলে গেছে। আমার চরিত্রহীনতার প্রমাণ তোমার ছেলেই তাকে দিয়েছে তোমার দেওয়া চিঠি দেখিয়ে। অসুস্থ স্ত্রীকে ছেড়ে যাওয়ার এই তো মোক্ষম সুযোগ! 

এলে না আর? দিলে না জবাব? আমার চারিদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে। চিঠিখানা আর পোস্ট করার ক্ষমতা নেই। যদি আসো, আমার কঙ্কালের পাশ থেকে নিয়ে যেও। 

স্বপ্ন কাকু কখন যে এসে ঘরে ঢুকেছে, আমার হাত থেকে ভালোবাসা কেড়েছে
আমার কিচ্ছু মনে নেই।

চলে গেছে সেই শেষ বার…

ক্যানভাসের উপর চাপা দেওয়া সাদা কাপড় সরিয়েছি
এক টানে…

চুল ওঠা স্তন হীন অসুস্থ এক নারী!
নীচে লেখা, 
ভালোবাসি। কিন্তু আমিও ফুরিয়ে এসেছি যে রমা!

আমার খোঁপার রজনীগন্ধা, ঠোঁটে গোলাপি
লিপস্টিক, শাড়ির পরিপাটি ভাঁজ কোথাও নেই
এক ফোঁটা…

খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল বাবা। 
মাকে বলেছিল, আহা আমরা ছাড়া কেউ তো নেই
ছেলেটার!

অনেক কষ্টে ধরে বেঁধে এক বছর পরে পুলিশ
একজন পাগলকে নিয়ে এল আমাদের বাড়ি

মুখ গাল ঠোঁট দাড়ি গোঁফে ভর্তি। মাথার চুল 
ঘাড় ছাড়িয়েছে। সারা গায়ে আঁষটে গন্ধ
স্বপ্ন কাকুর কোনো চিহ্ন নেই তার মধ্যে

বাবা নাক সিটকে বললো, না না এ আমার ভাই নয়
মা বললো, ঠাকুরপো শিল্পী! পাগল তো নয়!

পাগল টা বিড়বিড় করছে, যা কিছু নিভৃতের
তাকে রাখো অন্তঃপুরে…
রমা! আমিও যে ফুরিয়ে গেছি!

আমি চিৎকার করে উঠলাম! অফিসার!
এ আমার স্বপ্ন কাকু নয়!
নিয়ে যান ওকে! 

ওকে নিয়ে যান…

কান্না শেষ করে প্রশ্নটা গুছিয়ে রেখেছি মনের ভিতর…

পরের জন্মে রমা হয়ে স্বপ্নকাকুর কাছে জেনে নেব…
প্রিয়তম, আগে থেকেই তুমি কী করে বুঝেছিলে গো 
একমাত্র ভালোবেসেই ফুরিয়ে যাওয়া যায়?
—--------------––
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

স্বর্গ থেকে নীল পাখি নেমে এসেছে

স্বর্গ থেকে নীল পাখি নেমে এসেছে।
গমগমে ঘর
কর্ণ, কুন্তী সংবাদ বিতরণ করছেন মঞ্চের
আলো আঁধারী ঘুমন্ত কুরুক্ষেত্রে 
সঞ্চালনায় শান্ত উদার স্বর প্রক্ষেপন…

শত সহস্র দর্শক নিশ্চুপ মন্ত্রমুগ্ধ।

সমস্ত আয়োজনের শেষে নিভু নিভু রাত 
তানপুরায় বেঁধে নিল বিষাদ…
শূন্য এ প্রান্তরে ফিরে এস সুখ

পার্থ দা! 
বলো চন্দ্র…
তফাৎ কেবল এই, 
হ্যাঁ চন্দ্র, এ পারের দর্শক জ্বলে ওঠে আনন্দে
অন্ধকার চিরে আলো বুনতে জানে
দেবতার গ্রাস শুনে চিৎকার করে বলে, 
'শোন নি কি জননীর অন্তরের কথা?'
সে তো নয় দেবতা মোটে…
চন্দ্র!
এখনো অনেক বাকি পার্থ দা!
আমি ঘোষণা শুরু করি এইবার…

চন্দ্রমৌলি বন্দ্যোপাধ্যায়। হাতের মুঠোয় মাইক্রোফোন, চোখে জিজ্ঞাসা
শুরুটা করবো কোথায়?
গৌরী দি! এই যে এত প্রেম তোমার
ডেকে নিলে দাদাকে তোমার কাছে
বলো তো, এই দিয়ে করি শুরু?

আলোচনার শেষে আবার নামলো রাত
মঞ্চ ঝলমল করে উঠলো।
থোকায় থোকায় জোনাই আলোকসজ্জায়
মাইক্রোফোনের সামনে শুভ্র দুই ঠোঁট নড়ে উঠলো। 
আকাশবাণী আকাশ…
আজকের উপস্থাপনা…

করতালিতে চিরে যাচ্ছে সমগ্র আকাশের রাত্রি
ভীষণ আগ্রহে তারারা আবেগ ছুঁড়ে দিচ্ছে
আরো চাই! আরো চাই!
আমরা সৃষ্টি চাই!

সকাল হতেই টুক করে খসে পড়লো উল্কা-ফুল
তানপুরার সুর বদলে গেল একাদশী কন্যের হাতে
তার আবৃত্তি মুগ্ধ করে তুললো অপর প্রতিযোগীকে
বাহ! দারুণ কণ্ঠ তোমার! নাম কী? 
মেয়েটি বড় সপ্রতিভ… গৌরী। আর তোমার?
পার্থ। 
হাসছে চন্দ্র মৌলি। 
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভ্যেস করছে
আকাশবাণী পৃথিবী! আপনারা শুনছেন…

শূন্যতা কোনোদিন শূন্য থাকে না।
আবার মাটি জন্মায়।
—-----------––--–------–––
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

ভালোবাসা

আমার বড় ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়।
যে মানুষটা আমার ঘর কেড়ে নিয়ে
প্রাচীন মরুভূমির মত শুষ্ক হেসেছে
তাকেও আমার ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়
শ্যাওলা ছেড়ে দিয়ে আসতে ইচ্ছে হয়
তার শিরা উপশিরায়
তা থেকে তার হৃদয়ে সৃষ্টি হবে বাস্তুতন্ত্র।

যে মানুষটা আমার আলো নিভিয়ে
মুঠো মুঠো অন্ধকার ঢেলে দিয়েছে মাথায়
আমার খুব ইচ্ছে হয় তার খুব ভালো চাইতে
তাকে খুব ভালোবাসতে
একটা সূর্য তার উঠোনে বসিয়ে তাতে সার জল
দিয়ে ফল ফুলে ভরিয়ে দিতে

যে মানুষটা আমার সুর রক্তাক্ত করেছে
ভাষা রূদ্ধ করেছে
ভয়ংকর আনন্দে চিৎকার করেছে
তবে! এইবার কী করে আনন্দ গাইবি তুই?
আমার খুব ইচ্ছে করে, 
তার ঠোঁটের সেই হাসিতে আমার ভালোবাসা রেখে যাই
যদি কোনোদিন অ-সুরে তার কোনো ক্ষতি হয়!
ইচ্ছে করে, আমার অস্থি দিয়ে তার জন্য বজ্র বানিয়ে রাখি

যে মানুষটা আমাকে ভালোবাসতে চায়
যে মানুষটা আমাকে আঁকড়ে রাখতে চায়
জড়িয়ে রাখতে চায়
আমার জন্য ঘর আলো গান বেঁধে দিতে চায়
আমার খুব ইচ্ছে করে, তাকে জোর করে 
ছিটকে দিই আমার কক্ষ থেকে
আমার খুব ইচ্ছে করে চিৎকার করে তাকে বলি
ভালোবাসা এত সহজ নাকি, 
যে এত সহজে আমাতে বিলিয়ে দিতে চাইছো?
—-------------––-
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

যাপন

একদিন এসেছি মাটির বুকে শান্ত ছায়ায়
কোমল মায়ায়, খেলাঘরে।
এখানে পাখি ডাকে। গান গায়। আলো হয়ে
রোদ পড়ে।

বাতাসে বাতাসে সৌরভ ছোটে। ফুল ফোটে।
শিশির লুটায় ঘাসে।
পেখম মেলে প্রেমিক ময়ূর নৃত্যে ভোলায় মন।
আনন্দ ভালোবাসে।

বৃষ্টি নামে খুব। গা ধুয়ে গান লেখে।
পৃথিবীর উঠোনে সুখ
এখানেই স্বর্গ আঁকার ক্যানভাস। শাখায় শাখায়
স্নেহ আর শ্রদ্ধার মুখ। 

হৃদয় ডাকে হৃদয়ের তীরে। উচ্ছাস ঢেউ তার…
নাম লেখো, লেখো নাম তবে
কিছু নয় অক্ষয়। ধুয়ে যাবে প্রাণ
'অমর কে কোথা, কবে?'
তবু যাবে থেকে। ক্ষেতে সুখ ছুঁয়ে
অঘ্রাণ প্রতি মাসে
এ পৃথিবী ভুলবে তোমায়। তুমি থেকে যাবে
নবান্নের নিত্য সহবাসে।

যা করেছি ধুলো খেলা, যা রেখেছি আমার
আজ আর দাবি নেই কোনো
মেঘে মেঘে মিলেছে শরীর। শিশিরে কান্না
বাতাসে হিমেল মনও

যা কিছু বলেছি কথা, ফেলেছি ব্যথা
বৃথা ভুল চুক
মাটির বুকে মিলিয়ে নিও ক্ষমা
দুঃখ কষ্ট অহেতুক 

কাদা মেখে গড়েছি পুতুল। করেছি আলিঙ্গন
ভেবেছি জগৎ এই বেশ
থাকেনি শরীর। থাকেনি ক্লান্তি
ধোঁয়াতেই মুক্তি। এইটুকু অবশেষ।

তবু যদি ভেবে দেখো মণিকোঠায় আমি
একটুও আছি পাশে
মিশিয়ে নিও ভালোবাসায়। নতুন দিনের
সবুজ দূর্বা ঘাসে।

ডেকো না আমায় সাড়ম্বরে। 
রেখো না ফুল-ঝাড়ে
মুঠো ভর্তি আলো বুনো, একলা যাপন
অন্ধকারে
—------------–-
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

তিন মাস

কী মজা! এখনো তিন মাস আমি ফুল দেখব
আলো দেখব। অন্ধকারের গন্ধ নেব। 
আর তোমায় ভালোবাসবো। 

ইস কেন কাঁদছো এভাবে? 

দেখো আকাশের দিকে তাকাও।
মেঘকে জড়িয়ে রেখেছে আকাশ তার বুকে
অমনি করে আমায় ধরো তো দেখি একটু
আহ বড় শান্তি প্রিয় 

এই দেখো, দেখেছো! মেঘ ঠিক বৃষ্টি হয়ে ঝরতে
শুরু করলো।
আকাশ যে অত ভালোবাসলো
ফল কী হল? 
মেঘ কিন্তু বৃষ্টি হয়ে মাটিতে মিশে গেল।
আবার কবে সে বাষ্প হবে
আবার কবে ধুলো পাবে
পরের জন্মে আকাশে ফিরবে আবার সে!
আকাশ যদি জন্ম জন্ম অপেক্ষা করতে পারে তার
মেঘের জন্য, তুমি পারবে না?

তিন মাস! এখনো তিন মাস আমি বেঁচে থাকবো।
দুরারোগ্য কর্কট আমাকে তিন মাস কিচ্ছু করতে
পারবে না।
চলো পথে পথে পাথর সরিয়ে আদর ছড়াবো। স্নেহ
ভরাবো আমরা দুজন।
পাতায় পাতায় লিখে আসবো মায়া।

আলো ফলেছে যে গাছে তার নিচে বসে
গা মেলবো। প্রজাপতি হবে তুমি, আমি হলুদ ফুল।

আবার কাঁদছো? 
ও মা…দেখে যাও! তোমার ছেলে একটুও কথা
শুনছে না! 
মা! আজ কাঁচকলার কোপ্তা করেছ না? 
সত্যি! কেউ মৃত্যু আগে থেকে জেনে গেলে
বেশ কিন্তু হয়। 
কত যত্ন…ভালোবাসা

কিন্তু তোমরা এটা মনে রাখতে চাও না
আমি একটু এগিয়ে যাচ্ছি না হয়…
আমার পিছু পিছু আসবে তোমরাও
দশ, বিশ, পঞ্চাশ বছর পরেও
তোমরাও কিন্তু মাটিতে রাখবে শ্বাস।

মৃত্যুর মত অমর আর কী আছে?

আমার চলে যাওয়ার পরে আলো গাছ
বসিও খুব, প্রিয়।
অন্ধকারের গন্ধ এঁকো।
প্রজাপতিকে ফুল দিও
শূন্য ঘরে সুন্দর স্বপ্ন

এই শোনো না! এখন কথা, কান্নাকাটি বাদ।

একটা ভীষণ আবদার আছে তোমার কাছে।

তিন মাসের মধ্যে আমায় তিনশো লক্ষ
চুমু দেবে গো? 
–––---------–––
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)