নাম রাখব বনলতা

হে অনন্ত সময়! নির্ভার হও।

হে সূর্য! আরো আরো আলো দাও।

হে পবন! প্রবল বাতাসে বীজ উৎক্ষেপণ করে

রেখে এস কঠিন মরুতে।

হে ধরিত্রী মাতা! অপসারণ করো মরীচিকার 

অট্টহাসি। মরূদ্যান সৃষ্টি হোক।

বীজ থেকে প্রাণ।


হে জলধর! নেমে এস আমার দু চোখে

বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে লুকিয়ে ফেলো আমার অশ্রু...


দেখ, কেমন সেজেছি আজ!

এই শাড়িটা তোমার বড় প্রিয়

বলতে মাছরাঙার নীল আর রোদ্দুরের সোনা দিয়ে

শুধুমাত্র আমার জন্যই নাকি বানানো হয়েছে এ শাড়ি!

সঙ্গে পরেছি বনফুলের মালা, কানে কুন্দ। 

চুলে শিশির ভেজা দূর্বা।


তুমি বড় ভালোবাসতে এ ভোর বেলার গন্ধ

সারা শরীর ভিজিয়ে নিয়েছি তাই আজ।

তুমি এ ভোরের স্বাদ নিতে আমার চোখের পাতায়।

পাখি আঁকতে ঠোঁট দিয়ে

বলতে, 

দেখো তোমার দৃষ্টি কেমন উড়তে শিখবে এবার!


হে প্রবল বিষাদ! ছোট হয়ে এস।


যে বৃক্ষে তুমি কান পাততে,

গান বাঁধতে!

আমার হাত ধরে ছুট্টে নিয়ে আসতে

বলতে, শোনো শোনো এ কী বলছে শোনো!

বলছে ভালোবাসো!

বলছে, ছায়া নাও।


আমি খুব জোরে হাসতাম

তুমি অভিমানী হয়ে উঠতে তখন।

বলতে, আমার বন্ধু কাঁদলে কিন্তু ভালো হবে না বলছি!

খটখটে পাহাড় হয়ে যাব আমি!

আমি তোমার হাতে চুমো দিয়ে বলতাম,

আর আমি সে পাহাড়ের হৃদয় থেকে

ঝর্ণা হয়ে নেমে আসব। 


একটু আগে অবধি তোমার বন্ধু কাঁদছিল।

তুমি পাহাড় হয়ে গেছ,

আমি নদী হতে পারিনি!

ওকে রাখতে পারিনি।

ভিতরে ভিতরে ফোঁপড়া হয়ে গিয়েছিল নিজেই।

ভেঙে পড়ল। ছিঁড়ে পড়ল।


ওকেই সাজিয়ে দিলাম তোমার শরীরে।

ওর উপরেই তোমার ধুপ চন্দন চর্চিত গা...


হে গভীর শোক! থামো ক্ষণকাল

অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করি আমি


তুমি হাসছ? ভাবছ, খুব চেন আমায়?

আমি এ অবস্থায় কিছুতেই তোমার গান 

বাঁধতে পারি না!


এই তো তোমার দেহে আগুন স্পর্শ করল।

এই তো তোমাকে গান শোনানোর উপযুক্ত

সময় আমার! 


হে অগ্নিদেব! তিষ্ঠ সামান্য।


এইতো তোমার কানে ঠোঁট ছোঁয়ালাম।

আমার ভূমিতে তোমার শিকড়…

চিনতে পারলে এ গান?


শুনতে পাচ্ছ তুমি?

নাম রাখব বনলতা।


হে ধৈর্য্য! অনন্ত হও।

হে অপেক্ষা! নির্ভার হও।

--------------

SUJATA MISHRA




অন্তর-বাস

ছেলেটির প্রেমিকা এসে কেঁদে পড়ল ছেলেটির বিছানার পাশে, কী করব বলো! আমি তো রাখতেই চেয়েছিলাম কিন্তু মা বাবা কিছুতেই…

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ছেলেটি বলল, অথচ তুমিই বলেছিলে, এ থাকবে। আমার অপারেশনের পরেই তো আমরা বিয়ে করতাম! কিন্তু মৃতের স্মৃতি শুধু ফটো ফ্রেমেই হওয়া উচিত। ঠিকই করেছেন তোমার বাবা মা…তোমার বিয়ে, সংসার সব তো বাকি!


ছেলেটির আধো বোজা চোখের উপরে ঢেউ খেলে যায় কচি ধানের শীষ। পিউ কাঁহা পাখিটা ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে গেল, আমার নাম পাপিয়া। শুনছ তুমি?


ছেলেটা একসময় কবিতা লিখত। ওর প্রেমিকা জুঁই ওকে কাব্য বলে ডাকত তাই। আজ ওদের ভালোবাসার ভ্রূণটাকে শেষ করতে এসেছিল এই হাসপাতালেই… 

কী বলে ডাকল আজ সে তার কাব্যকে? নাহ ডাকেনি আজ। আর ডাকবেও না কোনদিন। ডাক্তার চৌধুরী যে আজ কেন এলেন না এখনও! ছেলেটি তাঁর কাছে রোজ একবার করে জেনে নেয় আর ঠিক কতদিন? আর কত ঘন্টা? ডাক্তার চৌধুরী রোজ তার বুকে, মাথায় রাখেন হাত।


ছেলেটি ভালো কোম্পানির চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে আগেই। কথা ছিল অপারেশনের পরেই চাকরিতে জয়েনিং, তার পরদিনই বিয়ে। রজনীগন্ধার জেগে থাকা রাতে তাদের গন্ধ বিলাস। একজন দুজন তিনজন...জুঁইয়ের পেটে কান রেখে সে বলবে, শুনছ! এখন তোমার মাকে আমি খুব আদর করব কিন্তু! 


অভ্র, উৎসব, অনিরুদ্ধ ছেলেটির ভালো বন্ধু। পায়ে পায়ে ফুটবল হোক আর স্নানে গানে ভেজা সুখ সবেতেই চার জুটি। 

জুঁই চলে যাবার পরেই ওরা এসেছে আজ। তোর চাকরিটা যদি আমাদের কাউকে একটা দিয়ে যাস… মানে যাকে তোর উপযুক্ত মনে হবে। প্রয়োজন যার বেশি…

তোর কোম্পানি বলেছে, তোর শেষ ইচ্ছে পূরণ করবেই! 

সেলাইনের ব্যথায় হাত বোলাতে বোলাতে ছেলেটি ভাবছে, কার প্রয়োজন বেশি!


বড্ড বেশি মাথায় ব্যথা আজ। ডাক্তার চৌধুরী কেন যে এখনও আসছেন না! 


সার্জারি রুমে ছেলেটির মাথা চিরে চিরে ডাক্তার চৌধুরী তাঁর এত বছরের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতায় বুঝেছিলেন, ভিতরের এ টিউমার ভালো হওয়ার নয়। এ ঘা শুকানোর নয়! পুনরায় সেলাই করে দিয়ে উনি বলেছিলেন, তোমার সময় বড় কম। বাড়ি যাবে?


ছেলেটির মা তো জন্ম দিয়েই গেছেন সে অন্য বাড়ি। বৃদ্ধ বাবা বললেন, আমি আর ও নিয়ে কী করব? এখানেই বরং ভালো থাকবে। কখন কী হয়…


ওই তো পাপিয়াটা এসেছে আবার। জানলা দিয়ে ঢুকে ছেলেটির মুখে লেগে থাকা খাবারের টুকরোটা খেয়ে নিল। ছেলেটি বলল, তুই আমার হবি আজ? পাপিয়া ডেকে উঠল, পিউ কাঁহা! 


হেই হুশ! দেখ দিকি কোথা থেকে মরা পাখি এসে বুকে বসেছে পেশেন্টের! পাপিয়াকে তাড়িয়ে দিল কর্তব্যরত নার্স। 


খুব জোরে ঝড় উঠেছে! ধুলোর ঝড়। চারিদিক অন্ধকার। ছেলেটির মাথার সেলাইগুলো সেই ঝড়ে উড়ে যেতে চাইছে! 


নার্স এসে বলল, তোমার সঙ্গে একটা ছবি তুলতে পারি? তোমার এত মনের জোর…

ছেলেটি মুচকি হাসল। নার্সের মোবাইলে যে কদিন থাকে, ওই হাসিটুকুই থাক। 


ঝড় থেমে সন্ধে নামল। ছেলেটির চারিদিকে তার চেনা অচেনা মানুষ। কোথাও ধান ক্ষেত নেই, পাপিয়া নেই, আলো নেই…


প্রেমিকা কাঁদছে। বলছে, আমায় ভুল বুঝো না! কোনদিন ভুলব না তোমায়! 

বন্ধুরা বলছে, চাকরিটা বল না কাকে দিতে চাস?

ছেলেটির বৃদ্ধ বাবা বলছে, জমানো সব শেষ বাবা!


ছেলেটি খুঁজছে। চারিদিকে চোখের মণি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুঁজছে।


ডাক্তার চৌধুরী ছেলেটির সেলাইয়ের পাশে হাত রেখে বললেন, কী খুঁজছ?


ছেলেটি শুষ্ক ঠোঁট নেড়ে বলল, অন্তর-বাস।


নার্স দুজন বোধহয় মধ্যের হাইফেন বুঝতে পারেনি। ফিসফিস করে বলে, মরার সময়েও এসব? কী অসভ্য রে বাবা!


ডাক্তার চৌধুরী ছেলেটির চিবুক ছুঁলেন… বললেন,

তোমার আত্মায় তোমায় অন্তর-বাস।


ছেলেটির নিঃশ্বাস পড়ল সন্ধের বুকে। 


পাপিয়া ঝড়ের পরেও ঘর খুঁজছে...পিউ কাঁহা!

---------------

SUJATA MISHRA

আমিই বিলে

আমি এখন ছোট্ট মানুষ

ধ্যানে বসেছি ধরো

বন্ধ দুচোখ, স্বপ্ন অনেক

মাটিও শক্ত বড়ো।


তুমি বলবে, 'বিলে কোথায়?

নরেন'ও তো নয়!'

তবু, আমার বজ্র মুঠি

একফোঁটা নেই ভয়!


বিবেক আমার গড়বে দেখো

মা যে শেখান রোজ

'মানুষ তুমি! মানুষ থেকেই

মানুষ নিও খোঁজ!'


ধরো, আমিই বিলে আজ।

কালকে নরেন আমি

অযুত হৃদয় গড়ব বুকে

বিবেকানন্দ স্বামী।

-------------------

SUJATA MISHRA

প্রমিথিউস

মন্দিরে মন্দিরে বন্দি দেবতা। ক্ষুধার্ত মানুষ রাত গভীর হলে দেবতার কক্ষে চোখ পাতে। নাহ, কোনো আওয়াজ নেই! দেবতা ঘুমিয়ে তবে? সারা গায়ে স্বর্ণ-খচিত শোভা। ক্ষুধার্ত হাত জোড় করে ফিসফিস করে, হে দেব! বড্ড খিদে! একটা অলংকার দাও না ছুঁড়ে! ওটা বিক্রি করে একথালা ভাত কিনি…


প্রবল নাসিকা গর্জন করে প্রবল নিরাপত্তা রক্ষীর...


ধৈর্য্য হারিয়ে ক্ষুধার্ত কণ্ঠ চিৎকার করে, কোথা গেলে ঈশ্বর? তুমি কি মরে গেছো? 


নিরাপত্তা রক্ষীর উত্তেজনা আর লাঠি দুইই আছড়ে পড়ে পিঠে তার।


গৃহস্থ নিদ্রিত। তেতলার ঘরে বনবন করে ঘুরছে পাখা। ক্ষুধার্ত এবার ছিনিয়ে নিতে চায় খাদ্য! একেবারে সে পাখা ঘোরা ঘরে উঁকি দেয়। ভাবে সবচেয়ে বেশি ভালো সবচেয়ে উর্দ্ধে…


কী আশ্চর্য! এখানেও সেই অলংকার বিভূষিত দেবতা! পাখার হাওয়ায় দিব্য ঘুমিয়ে! 


ক্ষুধার্ত হামাগুড়ি দিয়ে তেতলা পেরিয়ে একেবারে শীর্ষে গিয়ে ওঠে। 

তারপর সেখান থেকে আরো উর্দ্ধে আরো উর্দ্ধে আরো…


ক্ষুধার্ত শহীদ মিনারের উপরে উঠে নিজের বুক চিরে বের করে আনে হৃদয়…

জিউস আসবে ঈগল হয়ে 


ক্ষুধার্ত বলবে, আমি মানুষকে আমার ভাগের খাদ্য দিয়েছি, আমার হেঁটে চলার পথ দিয়েছি, আমার শুয়ে থাকার মাটি দিয়েছি…

আমার হৃদয় গ্রহণ করো জিউস!


জিউস হাসবে! ভয়ংকর হাসবে! ক্ষুধার্তের হৃদয় চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে…


শহীদ মিনারের নীচে আবার জন্ম নেবে লক্ষ লক্ষ ক্ষুধার্ত। গিজগিজ করবে তাদের হৃদয়!


হারকিউলিস দিবানিদ্রায় মগ্ন থেকে বিড়বিড় করবে, 

সবাই কি আর প্রমিথিউস, যে আমার বাঁচানোর দায়?

----------------

SUJATA MISHRA

গঙ্গা-জন্ম

গঙ্গার বাপ হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই গঙ্গার মা

তার সোহাগ খুঁজে বেড়ায়

এ পাড়া ও পাড়া ধান ক্ষেত শহরের অলি গলি...


কেঁদে কেঁদে ফেরে নিঃসন্তান গঙ্গার মা।


গঙ্গা জন্মায় নি কোনোদিন তার কোলে

তবুও সে গঙ্গার মা

হারুর মা, চাঁদুর মা, খগেনের মায়ের মত।


গঙ্গার মা নিঃসন্তান

সোহাগ-হারা। 


খুঁজতে খুঁজতেই একদিন সিদ্ধ হয়ে যায় গঙ্গার মা


ধান ক্ষেতের মধ্যে উপুড় করা তার দগ্ধ মৃতদেহ


কাদার উপর নিঃসন্তান নিরক্ষর গঙ্গার মা

আঙুলের ছাপ দিয়ে দিয়ে লিখে রেখেছে...

চারিদিকে গিজগিজ করছে জগাই মাধাই,

নিমাই কোথাও নেই!


গঙ্গার বাপ নগ্ন গায়ে ফিরে এসেছে

দিনের আলোয় তার গায়ে হাসি আর 

ঢিল ছোঁড়ে পাড়া।


রাত বাড়লে গঙ্গার বাপ

জগাই মাধাই ধরে ধরে ঝপাঝপ কোপ মারে।


বুক চাপড়ে ডাকে, 

গঙ্গার মা! কোথায় গেলি রে আমায় ছেড়ে? 

আমি তো তপস্যে করে গঙ্গা নামিয়ে আনতে গেছিলুম দেশে…

একটুন অপেক্ষা করলি নি?


ভোর হয়ে এলে ধান ক্ষেতে পোড়া আঙুলের ছাপে ঠোঁট রাখে গঙ্গার বাপ।

কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে,


পরের জন্মে তোকে বাঁজা বলেই ডাকবো রে বউ!

তাহলে আর গঙ্গার মত তার মায়ের সোঁতও 

কেউ আবর্জনায় নোংরা করতে পারবে নি!

--–---––-–---

SUJATA MISHRA

সেই ছেলেটা

গলির মোড়ে হঠাৎ দেখি মস্ত মেঘখানা

আড়াআড়ি উদাস চোখে শুয়ে।

থমকে দাঁড়াই,

সেকি আকাশ ছেড়ে তুমি এইখানে?


খানিক চুপচাপ

তারপরে মেঘ ভ্রু কুঁচকে বলে,

খুঁজছি খুঁজছি সেই ছেলেটা খুঁজছি


সেই ছেলেটা? কোন ছেলেটা?


যে ছেলেটা আমায় নিয়ে ছবি আঁকত

খাতায় ভরে কখনো হাতি কখনো রাজা

কখনো কবি কখনো আবার সমুদ্র বিশাল

বৃষ্টি ফুল পাখি সব…


ও হো থাক থাক খুব বুঝেছি

সেই ছেলেটা এখন তো সাঁতার ক্লাসে!


আমার কথা শুনে মেঘ কালো চুল সরিয়ে নিল

কপাল থেকে তার...

বললো, এই যে এখন আমি কাঞ্চনমালা

সাঁতার থেকে ফিরে এসেই সে আঁকবে আমায় ঠিক

একটু নাহয় বসেই থাকি!


আরে না গো! 

হতাশ করি তাকে।


সাঁতার শেষে তার তো আবার ক্যারাটে ক্লাস

ইংলিশ ম্যাথ জিওগ্রাফি টিউশন

তারপরে হোমওয়ার্ক, জিমন্যাস্টিক...


মেঘ এবার উঠে বসে

প্রবল জিজ্ঞাসা তার

ও তাই বুঝি? তবে কি আর আঁকে না সে,

রঙ চুবিয়ে খাতার পাতায়?


আঁকে আঁকে খুব আঁকে

এই তো সন্ধেতেই থাকে আঁকার ক্লাস ওর


রাত্রি আঁকে তবে? তারা জোনাই সুর?

মেঘের যেন তর সয় না আর!


আমি বোঝাই তার হৃদয় নিংড়ে ভেঙে

হ্যাঁ আঁকে তবে ঠিক রাত্রি নয়, 

ড্রয়িং টিচারের দেওয়া টাস্ক 


কপি করে? নকল পাহাড়, সূর্যোদয়?

সেই ছেলেটা আমায় আর কখনো আঁকবে না বুঝি?


দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে এবার আমার 

শ্বাস ফুঁড়ে ফুঁড়ে।

বলি, 

মেঘ তুমি ফিরে যাও!

সেই ছেলেটার আকাশ গেছে চুরি।

----------------

SUJATA MISHRA

ঔরস

।। এক ।।


নারী জন্মমাত্র থেকেই বলি-প্রদত্ত এ কথা শুনে একবিংশ শতকের গ্রাম গঞ্জ শহরের ইঁট কাঠ পর্যন্ত হেসে উঠলেও কিছু মানুষ চোখ পাকিয়ে রে রে করে ওঠেন, কেন নয়? কেন নয়! নারী অর্থে সুললিত কায়ায়, পুরুষের ছায়ায় পর-নির্ভর হলেই শোভনীয় মঙ্গল তাঁদের কাছে। 

সেইরকম এক দৃষ্টান্তমূলক পরিবার

রামকুমার মিত্রের নামেই তালপুকুর বাড়িখানি।


বত্রিশ পাটি দন্ত বিকশিত করে আছে সে বাড়ির প্রাচীর, দেয়াল ছাত। রং চটে পলেস্তারা খসে বৃদ্ধা ঠানদির ঘর হয়েছে ঐতিহ্যবাহী স্মৃতি-কথা। তবুও সে বাড়িতে গমগম করে ওঠে রামকুমার বাবুর গম্ভীর কন্ঠ, 'শোনো খোকার মা! এই বয়সেই এ বাড়ির নিয়ম শৃঙ্খলা শিখিয়ে দাও তোমার মেয়েকে। ওকে বলে দাও, ওর প্রতি ওর মেজ কাকার বন্ধুর আচরণ চৌকাঠ পার না হয়। আমি বরং মেজকে বলে দেব, ওই বন্ধুটি এ বাড়িতে যেন আর না আসে কখনো।' 


মায়ের কাঁধে মাথা রাখে অনুপমা। 'মা, বাবা ওনাকে শাস্তি দেবেন না কেন?' 

মা ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে বললেন, 'চুপ চুপ!

এটাই যে বাড়ির রীতি।'


অনুপমার পড়াশোনায় যতখানি মেধা এবং ইচ্ছে পরের ভাইটি ততখানিই দূর্বল ও ফাঁকিবাজ। তবুও মিত্রবাড়িতে ভাইয়ের বুদ্ধি বিকশিত করার জন্য দুধটা ফলটা বেশি করেই আসে। অনুপমা অবশ্য ভোজনে আসক্ত নয়, সে ছন্দে আসক্ত। সে চাঁদ সূর্য ফুল কবিতায় বিমোহিত। প্রতি মুহূর্তে সে কল্পনার মাটিতে নানা বিমূর্ত কায়া গড়ে, প্রতি মুহূর্তে ভাঙে। আবার নতুন সৃষ্টি করে। তার এই সৃষ্টির ভাঙা গড়া খেলা দেখার জন্য তার আভিজাত্য আঁকড়ানো বাড়িতে কেউই ছিল না। তাই নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতে অনুপমার শ্বাস দীর্ঘ হয়, অন্তর প্রস্ফুটিত হয়। মেজকাকার বন্ধুটির জন্য সে বাড়ির দরজা বন্ধ হলেও বাবার পিসতুতো এক দাদার আবির্ভাব হয় সে গৃহে। তেলতেলে মুখের উপর বসানো দুটো লোলুপ চোখ। অনুপমার বাবা তাঁর পায়ে শ্রদ্ধা ঢেলে বললেন, এ বাড়ি তো তোমারই দাদা! আজ থেকে এখানেই থাকবে তুমি। চুলোয় যাক তোমার ছেলেপুলে। অপদার্থ সব! নইলে বাবার সঙ্গে কেউ বিতণ্ডা করে!

অনুপমার হৃদয়ে তিরতির করে ওঠে ভয়।


।। দুই ।।


সুনিবেশবাবুকে ধরে পড়লেন সবাই। সাহিত্যের সেরা পুরস্কার পেয়েছেন তিনি! এ সারা বাংলার অহংকার, সারা দেশের অহংকার। সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন তাঁর স্ত্রী রত্নাকে, আপনার স্বামী সম্পর্কে যদি দু চার কথা বলেন…

রত্নার উজ্জ্বল মুখ, চোখে হাসি, দুই গর্বিত গালে টোল ফেলে বললেন, 'এ আনন্দ তো সারা দেশের!'

বছর চল্লিশের সুনিবেশবাবু তাঁর স্বভাবে নির্লিপ্তই রইলেন এত বড় সাফল্যেও। দৃষ্টিতে কল্পনা, হয়ত সেই মুহূর্তেই কোনো উপন্যাসের বীজ গ্রথিত হচ্ছে তাঁর মননে।


লোকজন সব চলে গেলে রত্না জড়িয়ে ধরলেন স্বামীকে, 'এ আমার স্বপ্ন ছিল সু! তোমার নামে আমায় চিনুক পৃথিবী। আমি অহংকার করে বলব…'

মুখের কথা নিয়ে সুনিবেশবাবু বললেন, 'তোমার যে ছবিটা পাঠিয়েছিলে সর্বভারতীয় অঙ্কন প্রতিযোগিতায়, তার কী হল রত্না?'

রত্না স্বামীকে ছেড়ে এগিয়ে এলেন বিছানার দিকে। চাদরের ভাঁজ ঠিক করতে করতে বললেন, 'এত সহজ নয়, মশাই! নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়া! সঠিক যোগ্যতা প্রয়োজন।'

দৃষ্টিশক্তিহীন মেয়ে অনুষ্কা পাশের ঘরে বেহালায় সুর তুলতে শুরু করেছে। সুনিবেশবাবু বললেন, 'এক কাপ চা দাও রত্না। অনুর সুর শুনতে শুনতে লেখাটা গুছিয়ে নিই।'

 

রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে রত্না ভাবলেন, 'এই মানুষ আসলে কী! এত আনন্দেও তাঁর মনে কোনো দোলা লাগে না? আমাকেও আনন্দ পেতে দিতে চান না তাঁর সাফল্যে! চান আমার পরিচয় হোক। আমার নিজের! এই কী তবে সম্মান? এই কী তবে সমতা? এই কী প্রকৃত ভালোবাসা?' মনে মনে ঈশ্বরকে প্রণাম করলেন রত্না, 'এমন মানুষ যেন প্রতি জন্মে জীবনে পাই আমি।'

পাশের ঘরে এসে মেয়ে অনুর মাথায় হাত রেখে বললেন, 'অনু! বাবার মত হ'স মা তুই!

বাবার মত।'

                 

।। তিন ।।


দিন দুই যেতে না যেতেই অনুপমা বাড়িতে আগত জ্যেঠুর লোভ আরো স্পষ্ট দেখতে পায়। নানা অছিলায় তাকে কাছে ডাকা, পায়ে, কপালে মালিশ করিয়ে নিতে নিতে দেশ বিদেশের যৌনতা নিয়ে কথা বলা অনুপমা কিছুতেই সহ্য করতে পারত না। অথচ প্রতিবাদ করার উপায়ও তার ছিল না। সদ্য ফুটে উঠতে চাওয়া কুঁড়ির ভিতরে লাজুক মিষ্টতায় আবিষ্ট হল ঘৃণা। কিছুদিন এভাবে চলার পর সে মনে মনে স্থির করল, কোনো উপায়ে এনাকে এই বাড়ি থেকে বের করতেই হবে।

দেড় বছরের ছোট ভাই পড়াশোনায় অসাধারণ না হলেও দিদির প্রতি ভাব এবং দুষ্টুমিতে নেহাত সাধারণ না। জ্যেঠুর কাছে যেতে দিদির কুণ্ঠা, কান্নার কাঁধে হাত রাখল ভাই, 'দিদি চিন্তা করিস না আমরা ওনাকে ঠিক এ বাড়ি থেকে বের করব দেখিস।'


গভীর রাতে মুখের উপর কালো হাঁড়ি তার উপরে সাদা খড়ির চোখ মুখ, জ্যেঠুর ঘুমন্ত শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে 'পালা বলছি মোহিতলাল!' চিৎকার এবং জ্যেঠুর ধড়ফড় করে উঠেই অজ্ঞান হওয়া, হঠাৎ ঘরের আলো জ্বলে ওঠা ও ভাই বিনুর ধরা পড়ে যাওয়া ভীত মুখ সব একসঙ্গে এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল যে অনুপমা নিজেও এতটা ভাবেনি। ভাইকে নিষেধ করলেও সে ভেবেছিল অত রাতে বাবা তো প্রতিদিনের মত ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাবেন, ভাই ভয় দেখিয়ে ফিরে পড়বে বাবা ওঠার আগেই নিশ্চয়। কিন্তু বাবা যে তখনো বিছানায় পিঠ পাতেননি নানা চিন্তায় তা দুই ভাই বোন কেউ ঠাহর করতে পারেনি। 

বিনুকে জোরে বকতেই বিনু প্রচন্ড রাগত স্বরে বলে উঠল, 'আমার দিদিকে দিয়ে পা টেপায় জ্যেঠু, আমি বেশ করেছি!'


প্রচন্ড মার খেল বিনু। সারাদিন খাওয়া বন্ধ হল অনুপমার। 'গুরুজনের প্রতি অশ্রদ্ধা! এই শিক্ষা তোমাদের?' মেজকাকা বললেন, 'তবে বলেছিলাম না আমি বন্ধু নিরপরাধ ছিল! এই অনুই বন্ধুদের পাল্লায় গোল্লায় গেছে। ওকে শিক্ষা দাও বৌদি!' 


দিন সাতেক পরে অনুপমা নিখোঁজ হয়। সারাদিন খোঁজাখুঁজির পরে যখন বাধ্য হয়ে পুলিশের শরণাপন্ন হতে নির্দেশ দিচ্ছেন বাবা মেজকাকাকে ঠিক তখন বাড়ির কাজের মেয়ে শম্পা অনুপমাকে প্রায় একপ্রকার জড়িয়ে ঘরে নিয়ে আসে। একেবারে ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। বাইরে এসে কাপড়ের খুঁট দিয়ে চোখের জল মুছে বলে, 'তোমাদের এই বড়লোকিপনা, এই সম্মান সম্মান করে হাঁক ছাড়া এসবের জন্যই এই মেয়েটা একদিন মরবে এই বলে দিলুম।'


রাতের অন্ধকারে সে জ্যাঠাকে বিসর্জন দিলেন অনুপমার বাবা, 'নেহাত তুমি আমার দাদা নইলে চাবকে পিঠের ছাল তুলে নিতাম আমি। আর কোনোদিন এ মুখো হবে না বলে দিলাম।'


।। চার ।।


অনির্বাণ ঘুরে দাঁড়াতে শিখেছে। অনেকদিন যন্ত্রণা সহ্য করার পরে সে তার শক্ত মেরুদণ্ডে বলতে শিখেছে, 'ভালোবাসা কোনো অপরাধ নয়। আমি পাপিয়াকেই বিয়ে করব বড়দা!' রামকুমারবাবু কঠিন চোখ নামিয়ে চটির শব্দ তুলে প্রবেশ করেছেন আভিজাত্যের ঘরে। বড় বৌদি চোখের কোলে চিকচিকে জল দিয়ে আশীর্বাদ করেছেন, 'অনি, ভালো থেকো দুজনে। মাঝে মাঝে তোমার দাদাকে লুকিয়ে ফোন কোরো ভাই!' মুখের আঁচল গলে কান্না নেমে এসেছে গালে বুকে।


পাপিয়াকে নিয়ে ঘর বেঁধেছে অনির্বাণ। নুন আনতে পান্তা ফুরালেও তাদের ভালোবাসা ফুরায় না। অনির্বাণের মনের ভিতরের বিষাদ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে, হন্যে হয়ে চাকরির চেষ্টা করে সে। চেষ্টা করতে করতে পেয়েও যায়। বাতাসে ভাসিয়ে দেয় আনন্দ। সাহস আর মিষ্টি নিয়ে একবার গিয়ে দাঁড়ায় দাদার মুখোমুখি।

-'কেন এসেছিস অনি?' দাদার কঠিন মুখ।

-'পাপিয়া খুব ভালো মেয়ে দাদা, হোক না অন্য জাতি, হোক না ভালোবাসা! তাও যখন ওকে মানলে না আমার কিছুই বলার নেই। আজ আমাদের আনন্দটুকু ভাগ করতে এসেছিলাম কেবল। আমি চাকরি পেয়েছি। এই মিষ্টিটুকু বিনু আর অনুকে দিলে খুব ভালো লাগবে।'

রামকুমারবাবুর দিকে মিষ্টির প্যাকেট বাড়াল অনির্বাণ। মুহূর্তের মধ্যে তার ঠাঁই হল জানলার বাইরে পথের ধূলায়। 

পাপিয়ার মাথা নিচু, চোখে জল।

অনির্বাণের চোখে আগুন, 'বড়দা! তোমার এই নিয়মগুলোর ফাঁসে পড়েই একদিন তুমি শেষ হবে, মিলিয়ে নিও।'

আড়ালে দাঁড়িয়ে বড় বৌদি বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

            

।। পাঁচ ।।


সুনিবেশবাবু নিজের ঘরে বসে বই পড়ছেন নাহয় কিছু লিখছেন নাহয় গভীর ভাবনায় মগ্ন রেখেছেন অন্তর, এমন সময় ঘরে এল অনুষ্কা। 

-'বাবা! আজ কলেজ যাবে না?' 

মুখ তুললেন সুনিবেশ, 

-'না রে মা আজ শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।' 

-'কী হয়েছে বাবা?' উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর অনুষ্কার।

-'না রে মা! তেমন কিছুই নয়। এমনিই।'

-'ও তাই বলো! তোমার মনের শরীর অসুস্থ!'

-'তুই আমার সত্যিকারের মা জানিস তো অনু!

ঠিকই বুঝতে পারিস আমার কখন কী হয়।'

-'তা মন কেন খারাপ বাবা তোমার? কোন লেখা নিয়ে বিব্রত?'

-'মনীষা। মনীষাকে কিছুতেই মারতে পারছি না। অথচ ওকে না মারলে আমার উপন্যাস কিছুতেই এগোবে না!'

-'বাবা, কোনো কোনো মৃত্যু জীবন বাঁচায়। যেমন মাছ। খাবি খায়, মরে আর আমাদের অসুখ ভাতে পাতের উপর সুপাচ্য ঝোল হয়ে পড়ে তাই না?'

-'অনু! তুই পারিসও মা! আচ্ছা তোর নতুন তোলা সুর আমায় কখন শোনাবি বল তো?'

-'তোমার মনীষার নতুন জীবন লাভের পরে।'

-'পাগলী আমার!'

রত্না আসেন, হাসেন, ভালোবাসেন। এ সংসারে বড় প্রেম, বড় মায়া। সুনিবেশ তাঁর কোনো কমতি রাখেননি। মেয়ের চোখে রাত্রি থাকলেও মেয়ে অনেক গুণের অধিকারী। তার সুরে জন্ম নেয় ফুল পাখি গাছ পৃথিবীও। তার সুরে মরুতে বৃষ্টি আসে নেমে, বৃষ্টিতে রোদ্দুর। রত্না আঁকেন। মনের খুশিতে নানারকম ভঙ্গিতে। না তাঁর কোনো উচ্চাশা নেই, নেই নিজের নামে নিজে গর্বিত হতে সে যতই তাঁর সু বলুন না কেন! তিনি এমন করেই বেঁচে থাকতে চান সারাজীবন।

সুনিবেশকে মনীষার গল্প এগোতে দিয়ে মা মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বেজে ওঠে টেলিফোন

-'হ্যালো স্যার! মনীষা বলছি!'


।। ছয় ।।


অনুপমার মনের মধ্যে ভয় থাকলেও বাবার প্রতি খানিক কৃতজ্ঞতাও আছে। বাড়িতে আর কোনো অযাচিত পুরুষ প্রবেশ করতে দেন না তিনি। চাকরবাকর দের মধ্যে মাত্র কিশোরীতেই সুন্দরী সুললিত অনুপমার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার মত কাউকে দেখলেই পত্রপাঠ বিদায় দিয়ে দেন তিনি। 

মেজকাকার বন্ধুবর্গ আগেই নিষিদ্ধ ছিল, ছোট ভাই বিনুকেও বলা হল, এ নিয়ম তার জন্যও। অনুপমা খানিক নিশ্চিন্ত হয়েই থাকত বাড়ির সময়টুকু। কিন্ত দু এক সপ্তাহ যাবৎ স্কুলে তার জন্য অপেক্ষা করে থাকছে এক অন্য অস্বস্তি। ক্লাস টেনের সুপ্রিয়দা তার দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক। কিছু যেন বলতে চায়, কী যে তার ভাষা বোঝে না অনুপমা। কেবল লজ্জায় মুখ নিচু করে থাকে সে। 


বিনুর হাতে একদিন এক ছোট্ট চিরকুট পাঠায় সুপ্রিয়, তাতে লেখা…'অনুপমা! আমি কিছুতেই বলতে পারব না কেবল বুঝে নাও।'

অনুপমা ভাইয়ের মুচকি হাসি চুপ করিয়ে বলল, 'এ কথা বাড়িতে বলিস না যেন ভাই!' চিরকুট ছিঁড়ে খুঁড়ে পড়ে রইল পথে। 


রাতে বিছানায় শুয়ে অনুপমা হৃদয়ের শেষ কিনারা অবধি খুঁজে এলেও সুপ্রিয়দাকে দেখতে পেল না। সুপ্রিয় তার কাছে ক্লাস টেনের প্রথম হওয়া শিক্ষকদের বাধ্য ছাত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।


তবুও স্কুলে সেই অস্বস্তি চলল, বিনুর হাসি, মাঝেমধ্যে 'বাবাকে বলে দেব!' ভয় দেখিয়ে চকলেট আদায় করা, মেজকাকার মাস্তানি, মায়ের কান্না, বাবার আভিজাত্য, নিরুদিষ্ট ছোটকা ও পাপিয়া কাকিমা এসব নিয়ে সময় এগিয়ে যেতে লাগল।


।। সাত ।।


-'মনীষা! বলো!'

-'স্যার আজ এলেন না কেন?'

-'শরীরটা ঠিক… কিন্তু তুমি ফোন করেছ কেন?'

-'আসলে স্যার আপনাকে খুব মিস করি তো তাই'

-'আমাকে মিস করো, না ক্লাস?'

-'আপনাকে।'

-'শোনো মনীষা! কথায় লাগাম দাও। আমি তোমার শিক্ষক। অহেতুক ফোন করে সময় নষ্ট কোরো না আমার!'


ফোন রাখার ঘন্টা খানেকের মধ্যেই হই হই করে বাড়িতে ঢুকল কলেজের রাহুল, প্রিয়াংকা, বিক্রম, রানা, আর মনীষা। 'শুনলাম স্যারের শরীর খারাপ তাই দেখতে চলে এলাম।'

রত্না ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ফ্রিজ খুলে মিষ্টি বের করে ট্রেতে সাজিয়ে পরিবেশন করলেন বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোকে। অনুষ্কা বেহালা বাজাল, ওরা সঙ্গত করল হাততালি দিয়ে, মুগ্ধতা দিয়ে। আর সুযোগ বুঝে মনীষা সুনিবেশের হাত ধরে বলে দিল, 'আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি স্যার।'


সুনিবেশ বেশ চিন্তিত। মনীষা রীতিমত সাহস দেখিয়ে ফেলছে দিনের পর দিন। ক্লাসে অতিরিক্ত মনোযোগ পেতে চাইছে। করিডোরে দাঁড়িয়ে কথা বলছে, স্টাফরুমে আসছে। বাড়িতে ফোন করছে, ভালোবাসি বলছে। সুনিবেশ এই চল্লিশের ঘরে এসে এক বিরাট ফ্যাসাদে পড়েছেন। এদের মনস্তত্ব তিনি বোঝেন। এরা নিজের জীবনকেও বাজি ধরতে পারে আবেগের জন্য। তিনি এও জানেন যে মোহ কেটে যাবে মনীষার, কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে বোঝানোর মত কিছুই করতে পারছেন না সুনিবেশ। 

অনেক ভেবে ফোন করলেন, 'মনীষা কলেজের পরে রেস্টুরেন্টে দেখা করো।'

হাতের উপর হাত রেখে মনীষা বলে, 'আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না স্যার।' হাত সরিয়ে সুনিবেশ তাকে বোঝান, 'এ হয় না মনীষা! হৃদয়ে প্রবেশ করা এত সহজ নয়! আমার স্ত্রী কন্যা সংসার থাকুক আর না, আমি এমন কিছু দেখিনি তোমার মধ্যে যা দিয়ে তোমায় ভালোবাসতে পারি।'

মনীষা বলে ওঠে, 

-'বলুন না স্যার! কী চাই আপনার?'

-আকাশ...মাটি...বৃষ্টি পারবে দিতে?'

-'এ তো কাব্য স্যার! আমি তো লিখতে পারি না!

ভালোবাসতে পারি।'

-'আমি লিখতে পারি, ভালোবাসতেও। শুধু হৃদয়ে বসতে দিই না। যাও ফিরে।'

 

কান্নায় ভেঙে পড়ে ছুটে যায় মনীষা। সুনিবেশ ভাবেন এত কঠিন না বললেও হত মেয়েটাকে। খুব ভুল হল তার। ভালোবাসার ভূত নামলে কাল সকালে তিনি মনীষাকে একবার ফোন করে নেবেন ভাবলেন।


সকালেই এল ফোনটা সুনিবেশের কাছে। 

-'মনীষা আত্মহত্যা করেছে স্যার! 

সুনিবেশ ছুটে গেল তার বাড়ি! এত দুরন্ত একটা প্রাণ কেবল তাঁর জন্য… কেন তিনি আর একটু সময় নিলেন না! কেন তিনি তাকে আরো বোঝালেন না? বুকের ভিতর একরাশ কান্না নিয়ে প্রবেশ করলেন মনীষার বাড়ি। নিথর দেহখানি শুয়ে আছে মেঝের উপর। মুখ ফ্যাকাশে, শরীরের সব রক্ত প্রায় বেরিয়ে গেছে কাটা শিরায়। মা-হারা মনীষার বৃদ্ধ বাবা কাছে এসে বললেন, 

-'কিছুতেই ডাক্তারের কাছে যাচ্ছিল না। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই মানসিক ভাবে অস্থির ছিল। এমন একটা যে করবে, ভাবিনি স্যার।'


সুনিবেশ বেরিয়ে এলেন। স্নান করলেন। কাঁদলেন। অনুষ্কা বাবার পাশে বসে জিজ্ঞেস করল, -'উপন্যাসের কতদূর গো বাবা? মনীষা কোথায়?'


।। আট ।।


অনির্বাণ পাপিয়ার এক ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে। পাপিয়া নাম রেখেছে রিনি। অনির্বাণ অফিসে বের হয়ে গেলে তার সময় কাটে ওই রিনিকে নিয়েই। কিন্তু তাদের ভরা সুখের জীবনে কোথাও যেন সেই ছন্দ নেই, সেই আলো নেই। আসলে ভালোবাসার আকাশে মেঘ জমলে তা বৃষ্টি হয় খুব কম, মেঘের পাথর হয়ে যায়। অনির্বাণ রাত করে বাড়ি ফেরে, অফিসের কাজের চাপে রাতেও কম্পিউটারে কাজ করে। মেয়েকেও সময় দেয়না পর্যন্ত। শেষ বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতিও ক্ষীণ। রান্নায় নুন কম বেশি কিছুতেই কোনো প্রতিক্রিয়া নেই অনির্বাণের। এমন চলতে চলতে একদিন পাপিয়া রিনিকে নিয়ে ঘর ছাড়ে, হৃদয় ছেঁড়ে। নিতান্ত অভিমানে পাথুরে মেঘ বুকে নিয়ে চলে যায় দূরে। অনির্বাণ দিনরাত পরিশ্রম করে অফিসের টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে হারিয়ে ফেলে সুখ। অভিমান ফুলে ওঠে তার বুকেও, 'পাপিয়া বুঝল না আমি কাদের জন্য এত পরিশ্রম করি! কেন আমি সময় দিতে পারতাম না! মেয়েটাকেও নিয়ে চলে গেল! বেশ।

আমি কিছুতেই আনব না।'


দুইদিকে প্রবাহিত হয়ে চলল ভালোবাসা, মধ্যে অভিমানের নদী। সময় বাড়লে যে নদীতে বন্যা হয়, প্রশস্ত হয় খাত। পাপিয়া পথ দেখে, অনির্বাণও। কেউ এগিয়ে এসে সে পথের শেষ করে না। পাপিয়ার দাদা তাকে প্রস্তাব দেয়, 'এ সম্পর্ক টিকিয়ে কী লাভ? বিচ্ছেদের মামলা করে দে। টের পাক সে!'

পাপিয়া সময় চায়। এক বছর...দু বছর

অনির্বাণের বাড়িতে চিঠি আসে, বিচ্ছেদ চাই সম্পর্কের। ভালোবাসাহীন দুটো নাম আলাদা হওয়াই তো ভালো! অনির্বাণ উদ্ভ্রান্তের মত ছুটে যায় এবার, 'না পাপু না! আমায় ক্ষমা করে দাও। আমার রিনিকে বুকে দাও আমার!'

পাপিয়ার দাদা ছুটে এসে ঘাড় ধরে বের করে দেয় অনির্বাণকে। 

-'এতদিন কোথায় ছিলে বাপু? এখন যেমনি টাকাপয়সা দিতে হবে, অমনি হুড়হুড় করে চলে এসেছ?' 

অনির্বাণ উদ্ভ্রান্তের মতোই বেরিয়ে এল আবার। বুকের ভিতরের অভাব তার মস্তিষ্কে পৌঁছাল। পায়ে হাতের স্নায়ুতে পৌঁছাল। চোখের তারায় ঘোলাটে জল, ঠোঁটের উপর এলোমেলো কথাদের ঘর। অনির্বাণ উন্মাদ হল। 


।। নয় ।।


রামকুমারবাবু ছেলেবেলা থেকেই দেখে এসেছেন পুরুষতন্ত্রের কঠিন বেড়াজাল। আগল দিয়ে রাখা মা ঠাকুমার বন্দীত্ব। প্রবল প্রতিবাদ এসেছে মনে কিন্তু পরক্ষণেই উদাহরণ এসেছে সামনে, বেশি প্রশ্রয়ে চন্ডীবাবুর স্ত্রী পলাতক, অধিক ভালোবাসায় মুকুন্দ কাকার গায়ে হাত তোলেন জ্যেঠি। সংসারে খবরদারি করেন অলোক দাদার বৌদি, অলোক দাদার মায়ের উপর অত্যাচারেও দাদা চুপ। আর এই প্রৌঢ়ে বিনু উদ্ধার করে নিয়ে আসে তাঁর ছোট ভাই উন্মাদ অনির্বাণকে। চিকিৎসার খামতি রাখেননি তিনি। বছরখানেক ভর্তি রাখলেন মানসিক হাসপাতালে। তারপর নিয়ে এলেন বাড়িতে, ডাক্তারের পরামর্শ মতই। অবিবাহিত মেজ ভাই হাসল, বলল, 'ঠিক হয়েছে!' তারপর নিজের ব্যবসা বাড়াতে বড়দা রামকুমারবাবুর সম্পত্তির অনেকাংশ নিয়ে চলে গেল বিদেশে। 

রামকুমারবাবু, অসুস্থ ভাই, প্রৌঢ়া ভীত স্ত্রী, রূপবতী মেধাবী কন্যা এবং সহজ সরল বোকা পুত্র, তাঁর আভিজাত্যের শাসন নিয়ে এগিয়ে চললেন। 


অনুপমা অবসর পেলেই ছোটকার পাশে এসে বসে। অনির্বাণ খাতার পাতায় শুধুই মুখ এঁকে চলে। দুটো চোখ একটা নাক, ঠোঁট আর শূন্যতা। সে মুখ যে কার, শিশুর নাকি বৃদ্ধের নাকি পাপিয়ার বোঝার উপায় নেই। আঁকে আর কাটে। কাটে আবার আঁকে। অনুপমা অনির্বাণের চোখের জল মুছিয়ে দেয়, খায়িয়ে দেয়। কাটা ছবির পাশে পৃথিবী আঁকে। গাছপালা পাখি পশু বৃষ্টি।

অনির্বাণ ঘুমোতে ঘুমোতে কথা বলে ওঠে, -'পৃথিবীর কোথায় হৃদয় মেরামত হয় গো?'

অনুপমা সুপ্রিয়দার কথা ভাবে। ক্লাস টেনের সেই চিরকুট দেওয়ার পরে আর কোনোদিন সে কোনো কথা তাকে বলেনি। স্কুল শেষ হয়েছে তার। ভালো ফল করেছে। কলেজে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু অনুপমার স্কুল ফেরতা পথে দাঁড়িয়ে থেকেছে। চোখের কোণে চিকচিকে জল নিয়ে তাকিয়ে দেখেছে। বিনুর হাতে নোটস পাঠিয়ে বলেছে, -'তোর দিদির কাজে লাগতে পারে।'

অনুপমার মনের মধ্যে তৈরি হয়েছে মায়া। রাতের পর রাত জেগে থেকে সে মনকে প্রশ্ন করেছে, 'এই কী ভালোবাসা?' কোনো উত্তর দিতে দেয়নি সে মনকে। ছোটকার দিকে তাকিয়ে সব ছেঁড়া ছবির উপর পৃথিবী এঁকেছে। ঘাস পাতা ফুল ফল পাখি…


।। দশ ।।


রত্নাকে মনীষার সব কথা খুলে বলেছিলেন সুনিবেশ। রত্না মনীষার মৃত্যুতে কষ্ট পেলেও তাঁর স্বামীর দৃঢ়তায় খুশি হয়েছিলেন। সুনিবেশের উপন্যাসে মনীষার নতুন জন্ম হয়েছিল। মৃত্যুর পরের জন্ম। যা ভেবেছিলেন সুনিবেশ তা তিনি লিখতে পারেননি। মনীষার পুনর্জন্মের পরে তার হৃদয়ে তুলে দিয়েছেন তার ভালোবাসাকে। সে ভালোবাসা বিবাহিত নয়, সে ভালোবাসা রূঢ় নয়, সে ভালোবাসা অধ্যাপক নয়। তার মতোই ছুটে বেড়ায়, হেসে বেড়ায়। মনীষার বৃদ্ধ পিতাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন কন্যার নতুন জন্মের পরিচয়,  দিয়েছেন আনন্দ, প্রাপ্তি। 

হাততালি দিয়ে উঠেছে অনুষ্কা, 'এইতো চাই বাবা!

সবাই সুখী হোক, কী জীবনে কী গ্রন্থে।'

এসব অনেক দিন আগের কথা। সেই উপন্যাস সুনিবেশকে আরো বড় পুরস্কার পাইয়ে দিয়েছে। শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক সুনিবেশ রত্না এবং রত্ন অনুষ্কাকে নিয়ে গড়ে চলেছেন দৌড়। স্ত্রী রত্না আঁকার খাতায় খানিক বিশ্রাম নিতে চাইলে তিনি ঠোঁটে চুম্বন করে বলেছেন, 'থেমে গেলে তো পূর্ণচ্ছেদ!' 

রত্না আবার শুরু করেছেন। অনুষ্কার সুরের সিডি বিক্রি হচ্ছে বেশ, সাংবাদিক ক্যামেরা কলম কাগজ যত্ন স্নেহ প্রেম একত্রে বাস করে যে ঘরে, তার নাম সুনিবেশ সু-নিবাস।

তথাপি ঘুমের মধ্যে মনীষা নেমে আসে। সুনিবেশের পাশে বসে জিজ্ঞেস করে, 'স্যার, একবার আমার হাতটা ধরবেন স্যার? কেবল একবার!' 

সুনিবেশ সে হাত ফিরিয়ে দেন। চিৎকার করেন, -'আমি তোমায় ভালোবাসি না মনীষা! কেন বুঝছ না! কেন মরে গেলে? কত তো ভালো ছেলে আছে! কেন আমার জন্য চলে গেলে তুমি?'

রত্না সুনিবেশের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। উঠিয়ে জল খায়িয়ে দেন। বলেন, 'এভাবে ওকে মনে রাখলে ওর আত্মার শান্তি হবে না যে!'


।। এগারো ।।


পাপিয়া কাঁদে। রিনি মায়ের বুকে মুখ গুঁজে জিজ্ঞেস করে, 'বাবা কোথায় মা?' 

পাপিয়া দাদার কাছে ছুটে যায়- 'দাদা একবার ওর কাছে আমি যাই!' দাদা কঠিন মুখে চোয়াল শক্ত করে, 'এ হয়না পাপু! আমাদের পরিবারের এক সম্মান আছে! ওই অহংকারী অভদ্র লোকের কাছে আর আমরা তোকে যেতে দেব না!' 

রিনিকে জড়িয়ে ধরে পাপিয়া। "তোর বাবা বাণিজ্যে গেছে বাবা। হিরে জহরত নিয়ে ফিরবে গান গাইতে গাইতে,

'আমার চাঁদের কণা রিনি মাগো

বাবা এসেছে জাগো জাগো'..."

রিনি বাবার গল্প শুনতে শুনতে বাবাকে বুনতে বুনতে ঘুমিয়ে যায় মায়ের বুকে।


পৃথিবীতে এমন কোনো কোনো মানুষ থাকে, তারা ঠিক ভুল ভালোবাসা সব বুঝতে পারে কিন্তু কোনোকিছুর ভালো খারাপ প্রয়োগ করতে পারেনা। অন্যায় হচ্ছে জেনেও প্রতিবাদ করতে পারে না। কৃত ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে ইচ্ছে হলেও করতে পারে না। পাপিয়াও পারে না। 


প্রবল এক ঝড়ের বিকেলে বিনুর হাত ধরে পাপিয়ার সামনে তার দাদার বাড়িতে এসে দাঁড়ায় অনির্বাণ। এলোমেলো দৃষ্টি, অগোছালো পদক্ষেপ

পাপিয়া ডুগরে ওঠে, 

-'এ কী অবস্থা বিনু ওর?'

-''তোমাদের এতদিন খুঁজে পাইনি কাকিমা! কাকা ঠিকানা বলতে পারেনি। গতকাল হঠাৎ কাকার পুরানো ডায়েরির পাতায় খুঁজে পেয়েই…'

-'কিন্তু এরকম কী করে হল?'

-'আমি স্টেশনের পাশে পড়ে থাকতে দেখেছি কয়েক বছর আগে। জানিনা কী করে।'

-'বিনু ও কি আমায় চিনতে পারছে না? রিনি রিনি কোথায় গেলি মা, এই দেখ তোর বাবা ফিরে এসেছে, আয় দেখবি আয়।'


এগিয়ে আসে পাপিয়ার দাদা। 

-'কী রে তুই? এখন এই পাগলটার জন্য চোখের জল ফেলছিস?'

বিনু কাগজটা বাড়িয়ে দেয়। 

-'এতে কাকার সই করা আছে কাকিমা। তুমি মুক্ত। কাকাও। চলি।'


রিনির ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তখন অনির্বাণ বলে চলেছে, 

-'এক দেশে এক রাজা ছিল তার যে রানী মস্ত অভিমান তাদের মেয়ে… তাদের মেয়ের হারিয়ে গেছে গান…'

বিনু কাকাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল পাপিয়ার দাদার বাড়ি থেকে।


।। বারো ।।


রামকুমারবাবুর মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে পথে। হয়ত কাকতলীয়ভাবেই তাঁকে উদ্ধার করে সুপ্রিয়। বাড়ির লোকজন পৌঁছানোর আগেই প্রয়োজনীয় রক্ত তাঁর শরীরে পৌঁছে দেয়। বুকে হাত রেখে দেয় ভরসা। অনুপমার চোখ ছাপিয়ে নামে কান্না, অনুপমার মা সুপ্রিয়র মাথায় হাত রেখে বলেন, -'তুমি দেবদূত বাবা!' 

একটানা পনের দিন হাসপাতালে থাকার সময় সুপ্রিয় নিজের ছেলের মতই বিনুর পাশে পাশে থেকেছে। রামকুমারবাবু বাড়ি ফেরার আগে তার দিকে তাকিয়ে বলেছেন, 'এ রক্তের ঋণ কখনো শোধ করতে চাইব না, শুধু যদি কণামাত্র তোমায় দিতে পারি, ধন্য মনে করব।'


অনুপমার বাড়ানো হাতে হাত ছোঁয় সুপ্রিয় প্রথমবার। অনুপমা সে হাতে আঙুল দিয়ে লিখে দেয়, 'ভালোবাসি।' 


।। তের ।।


সুরের সাথে সাথে অনুষ্কা এক স্কুলে চাকরি নিল। রত্না এবং সুনিবেশ দুজনেই চেয়েছিলেন মেয়েও দাঁড়াক নিজের পায়ে। ব্রেইল শেখাতে শেখাতে সে সুর বোনে, সুর বুনতে বুনতে রবীন্দ্রনাথ শেখায়। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই অনুষ্কা এক ছাত্রপ্রিয় দিদিমণি হয়ে ওঠে। বড় কাছের হয়ে ওঠে স্কুল শুরুর গান, হাসি অন্ধকার পৃথিবীর আলোকময় নক্ষত্র। অনুষ্কার হৃদয় উৎসারিত হয়ে ভালোবাসা ধাবিত হয় কচি কন্ঠের সে আনন্দে। তারা আবৃত্তি করে, 'আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের পর,' অনুষ্কার বাজানো সুরের সঙ্গে গেয়ে ওঠে 'এ কি লাবণ্যে পূর্ন প্রাণ প্রাণেশ হে…' অনুষ্কা এক অন্য পৃথিবী খুঁজে পায়, অন্য আনন্দ। সুনিবেশ বলেন 'এই তো আকাশ! এইতো সোনার তরী! রাশি রাশি ভরে নাও হৃদয়।' 


সুনিবেশের কাছে রিসার্চ করে মেধাবী সুপ্রিয় কলেজে চাকরি পেয়েছে। অনুপমার সঙ্গে ভালোবাসার বিনিময় শেষে অন্তত মাসে একবার সে আসে স্যারের বাড়ি। সুনিবেশ সুপ্রিয়কে পেলেই বসে যায় ভাবাবেগে। রত্না নিয়ে আসেন সুপ্রিয়র পছন্দের মিষ্টি। পাশের ঘরে সুরের মূর্ছনা ওঠে অনুষ্কার। সেদিন সুপ্রিয় সকালে এসে কিছু সময় কাটানোর পরেই সুনিবেশ তার কাছে প্রস্তাব রাখে, 'আজ বাড়ির গাড়িটা একটু খারাপ হয়েছে সুপ্রিয়, অনুকে একটু পৌঁছে দেবে স্কুল? তুমি তো কলেজেই যাবে নাকি!'

সুপ্রিয়র কলেজের পথেই অনুষ্কার স্কুল। তাই সানন্দে রাজি হয় সুপ্রিয়। গাড়িতে উঠে পাশের সিটে বসে অনুষ্কা। 


-'এই এক গন্ধে আমি মাতাল হই, নেশাগ্রস্ত হই সুপ্রিয়!'

-'কোন গন্ধে?'

-'জানিনা!'

-'তবে বললে যে!'

-'দৃষ্টি নেই তো, ঘ্রাণ বড় প্রবল।'

-'তোমার স্কুল এসে গেছে অনুষ্কা।'


অনুষ্কা নেমে আসে গন্ধটাকে ছেড়ে। দীর্ঘদিন ধরে সে এই গন্ধে নেশাগ্রস্ত হয়, আঁকড়ে ধরতে চায়। কিন্তু এক ইন্দ্রিয়ের অক্ষমতা তাকে বলতে দেয়নি। ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে পারেনি। আর অনুপমায় অনুরক্ত সুপ্রিয় কোনদিন সে অন্ধ চোখ, সে আসক্তি, সে সুরের অপেক্ষা বুঝতে পারেনি।

    

।। চোদ্দ ।।


অনুপমা সুপ্রিয়কে ভালোবাসে, সুপ্রিয় অনুপমাকে। রামকুমারবাবু বোঝেন, মনে মনে পছন্দ করেন কিন্তু প্রকাশ করেন না। বিনুর হাতে তুলে দেন পারিবারিক ব্যবসার ভার। অনির্বাণ ছাদের বাগানে ফুল ফোটায়, কাঁদে। অনুপমা সুপ্রিয়র সঙ্গে দেখা করে পরিকল্পনা করে কাকিমাকে যদি শেষবারের মত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যায়…

অনেক ভাবনা চিন্তা শেষ করে দুজনে গিয়ে উপস্থিত হয় পাপিয়ার দাদার বাড়ি।

-'এই শেষবার এসেছি কাকীমা! ছোটকার কান্না আর যে সহ্য হয়না!'

পাপিয়ার দাদা বেরিয়ে এসে বলে, 

-'তোমাদের সাহস তো কম নয়! ডিভোর্সের পর আবার এসেছো?'

পাপিয়া রিনির হাত ধরে এক ছুটে বাইরে এসে বলে, 

-'কীসের স্বার্থ দাদা তোমার? কেন আমায় এভাবে আটকে রেখেছ এত বছর? আমি তোমাদের কোন সম্মানে আঘাত দিয়েছি বলতে পারো? বাবা আমার নামে বাড়ি সম্পত্তি দিয়ে গেছে, ও বাড়ি চলে গেলে যদি তার ভাগ নিই এই ভয়ে তুমি আমায় রুদ্ধ করে রেখেছ দাদা! তুমি মানুষ?'

-'তোকে এসব কে বলেছে? তোর ভালোর জন্যই…'

পাপিয়ার বউদি এসে পাপিয়ার কাঁধে হাত রাখে। -'আমি বলেছি। ওদের দুজনের কষ্টের শ্বাস আমার জীবনেও পড়ছে যে গো!

পাপু তুমি যাও বোন।'


রিনি একছুটে বাবার বুকে পড়ে, মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, 

'সেই গানটা গাই মা? 

রিনি এসেছে জাগো বাবা

রিনি এসেছে জাগো…'


রামকুমারবাবু চোখ মুছে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। অনুপমা সুপ্রিয়র দিকে তাকিয়ে বলল, 'এভাবেই থেকো কিন্তু!'

সুপ্রিয় হাসল। বলল, 

'বুকের বামে হাত রেখো। যা শুনবে তাই আমি বলছি।'


।। পনের ।।


-'ও, সুপ্রিয় এসেছ? আজকেও আমার গাড়িটা খারাপ হয়ে গেছে। অনুষ্কার এদিকে স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে। একটু যদি…'

-'হ্যাঁ স্যার নিশ্চই!'


সুপ্রিয়র হাতের উপর হাত রেখে অনুষ্কা বলে, -'এইটুকুই চেয়েছিলাম। ক্ষমা করো। আর চাওয়ার কিছু নেই।'

সুপ্রিয় এবার বুঝতে পারে প্রথমবার। 

'অনুষ্কা আমার হৃদয় যে অনুপমার!'

-'বললাম না আর কিছু চাইনা আমার!

একটা ইন্দ্রিয় যে নেই আমার। সূর্যেও রাত। ভীষণ কষ্ট হয়, তবুও চাই কি? না চাই না। মাঝেমধ্যে সূর্যের গন্ধ নিয়ে নিই বুকে। ব্যাস!'

কথা বলতে বলতে, গন্ধ নিতে নিতে, ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে দিতে দুর্ঘটনা যে কখন ঘটে যায়!!


নিথর দেহ দুটো যখন সুনিবেশ আর রত্নার সামনে এসে পৌঁছায়, তখনও পৃথিবী পৃথিবীতেই।


রত্না পক্ষাঘাতে, সুনিবেশ বাকহীন, অনুপমা চেতনরহিত, রামকুমারবাবুর নামেই তালপুকুর বাড়িতে আভিজাত্য ভেঙে টুকরো করে বুক ফাটা আর্তনাদ…


সুনিবেশবাবুর উপন্যাসে তখন ঘোড়ায় চড়া সৈনিক প্রশ্ন করছে বাতাসকে, 'বলো তো! যুদ্ধ করতে করতে কবি হওয়া যায়?'


।। ষোলো ।।


কেটে গেছে আরো বছর তিনেক। অনির্বাণ সুস্থ হয়েছে। বিনু ব্যবসার কাজে দূর দেশে। রামকুমারবাবুর ওষুধের ডোজ উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। অনুপমা চাকরি পেয়েছে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে সুনিবেশের বাড়ি যাতায়াত শুরু করেছে নিয়ম করে।

সুপ্রিয়র ডায়েরির পাতা উল্টাতে উল্টাতে অনুপমা আজ বুঝতে পেরেছে অধ্যাপক সুনিবেশ বাবুই সুপ্রিয়র জীবন ও সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি তথা জীবনদর্শনের গুরু। ডায়রির একটা পাতায় সুপ্রিয় লিখে গেছে, 'এরকম হাজার সুনিবেশ স্যারের জন্ম যদি আমি দিতে পারতাম!


অনুপমা রত্নার পক্ষাঘাতগ্রস্ত শরীরে যত্ন দেয়। ডাক্তারের সাহায্যে, পরম যত্নে সুনিবেশের বাকশক্তি ফিরিয়ে আনে। সুপ্রিয় তার স্যারের স্পর্শে আকাশ পেত, অনুপমা মাটি হয়ে ছুঁতে চায় সেই আকাশ।


সুনিবেশ বলে চলে, "বাতাস উত্তর দেয়, 'হ্যাঁ সৈনিক! তোমার হৃদয়ে যদি বাস করে আকাশ পর্বত অথবা তুমি যদি বুনতে পারো ভালোবাসা তবে নিশ্চিত তুমি কবি!'..."

লিখে চলে অনুপমা। 

সুনিবেশ আর লিখতে পারেন না এখন। 



লিখতে লিখতে অনুপমা বিভোর হয়। এক প্রায় বৃদ্ধ মানুষের মধ্যে সতেজ সুপ্রিয়কে খুঁজে পায়। তারপর আসে সেইদিন…

-'অনুপমা!'

-'হ্যাঁ স্যার…'

-'কী পাও তুমি?'

-'কী খোঁজো? সুপ্রিয়কে?'

-'আপনার মত বৃক্ষকে।'

-'কী চাও?'

-'আপনাকে। একটিবার।'

-'আমার সারা শরীরে আপনাকে রাখতে চাই।

সুপ্রিয়কে হৃদযে রেখে আপনাকে একটিবার ভালোবাসতে চাই।'

-'মনীষা?' 

-না, আমি অনুপমা। গাছ বুনতে চাই। ছায়াশীল, মায়াশীল, আর এক বৃক্ষ।'

চিৎকার করে ওঠেন সুনিবেশ।

-'এ হয়না!'

পাশের ঘরে রত্না বিছানা থেকে পড়ে যান।

সুনিবেশ অনুপমা ছুটে যান। 

রত্না বিড়বিড় করেন,

'তুমি কাউকে কষ্ট দেবে না সু! কাউকে না!'


।। সতের ।।


রামকুমারবাবু মেয়ের জন্য পাত্র দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁর শরীরটাও ভালো যাচ্ছেনা। কিছু হয়ে যাওয়ার আগেই একটা ব্যবস্থা করতে হবে। রিনি আড়াল থেকে জ্যেঠু জেঠিমার আলোচনা শুনে সারা বাড়ি নেচে নেচে ফেরে, 'দিদির বিয়ে হবে! দিদির বিয়ে হবে!'


অনুপমা সুনিবেশের সামনে বসে, সুনিবেশ এক দৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে। 

-'এমন কেন করছো? তুমি বাচ্চা মেয়ে! আমার মেয়ের বয়সী উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ!

আমি এক সন্তানহারা পিতা, অসুস্থ স্ত্রীর স্বামী।'

-'আর এক বিরাট প্রতিভা! বিরাট বৃক্ষ! 

আমি একটা চারা চাই। শরীরে সেই বৃক্ষের স্পর্শ চাই।'

-'মনীষা চলে গিয়েছিল। তোমায় যেতে দেব না। কিন্তু শর্ত একটাই, যদি তোমার গর্ভে জন্ম নেয় কোনো উপন্যাস, তার নামকরণ আমি দেব না।

পারবে তো সামলাতে?'

-'পারব।'

অনুপমার দৃপ্ত কন্ঠস্বর।

'আমার হৃদয় যাকে ভালোবাসে, আমিও তাকে।'



বাইরে প্রবল ঝড়, অন্ধকার ঘর। দুটো অসম শরীর মিলে যাচ্ছে। জুড়ে যাচ্ছে। চারটে চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে স্বর্গীয় ক্ষণ। রত্না পাশের ঘর থেকে বলে যাচ্ছেন ক্রমাগত, 'বড় যন্ত্রণা সু! ওকে ফিরিও না! মনীষাকে ফিরিও না! অভিশাপ লাগবে সু!'


।। আঠারো ।।


অনুপমার গর্ভ উন্নত হচ্ছে। রামকুমারবাবুর অভিজাত সত্তা ধুয়েমুছে এখন কেবল কান্না আসে। পাপিয়া আগলে রেখেছে তাকে। অনির্বাণ বারবার জানতে চেয়েছে, 'কার ফল এ গর্ভ?' তার নির্লিপ্ত ভীত মা সদর দরজা বন্ধ রেখেছে। বিনুও মেজকাকার পথ অনুসরণ করে বাড়ি ছেড়ে ব্যবসা নিয়ে চলে গেছে। অনির্বাণের ছোট চাকরির টাকায় ভাতের উপর জুটছে নুন। পড়শিরা থুথু ছিটিয়েছে, গালমন্দ করেছে, করুণা করেছে। 


অনুপমার পুত্র সন্তান হয়েছে। 


সুনিবেশের বাড়িতে দেখাশোনা করার দুটো লোক রেখেছে সরকার। ওষুধপত্র, হাসপাতাল, চিকিৎসা, যত্ন সবকিছু দিয়ে তারা বাঁচাতে চায় রত্ন সুনিবেশকে।


।। উনিশ ।।


ছোট্ট পাহাড়ঘেরা গ্রামে অনুপমা চাকরি নিয়ে এসেছে। কচি মুখে মা ডাক এসেছে। 

রামকুমারবাবু নাতি দেখার আগেই মারা গিয়েছিলেন, মা নাতি হওয়ার পরেও তার মুখ না দেখেই। 


অনুপমার কোলের আলো কচি পায়ে এলোমেলো ঘুরে বেড়ায় আর ছড়া বলে। আঙুলে সুর তোলে। 

একটু বড় হয়ে স্কুলে ভর্তি হয়। আঙুল ওঠে ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামেও। ছেলের কৌতূহল, 'কে আমার বাবা! বলো না মা!'


ছেলের প্রশ্নে অনুপমা উত্তর দেয়, 'যিনি সবার পিতা তিনিই তোমার। ঐ যে সূর্য উনি তোমার পিতা।'

পড়তে পড়তে, লিখতে লিখতে, সুনিবেশ বৃক্ষের  চারা বড় হয়। প্রতিভার বিচ্ছুরণ হয় তার। গল্পে কবিতার অবয়বে জীবন দর্শন ফুটে ওঠে। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে ছোট পাহাড়ি গ্রামের পিতৃপরিচয়হীন সুপ্রিয়। অনুপমা তার হৃদয়ের নামেই ছেলের নামকরণ করেছিল। 

ধীরে ধীরে সাহিত্যের অন্যতম পুরস্কার লাভ করে সে ছেলে। 


পুরস্কার লাভের পরে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়, 'সুপ্রিয় বাংলা সাহিত্যের এক প্রখ্যাত নাম। যদিও তাঁর পিতার পরিচয় জানা যায় না, হতে পারেন তিনি সত্যকাম, জাবালার পুত্র…'


।। কুড়ি ।।


পক্ষাঘাত সেরে গেছে রত্নার। একটু একটু করে তুলি ধরেছেন তিনি। সুনিবেশকে চা করে দিয়েছেন। হাতে হাত ধরে অনুষ্কার জন্য কেঁদেছেন। তার বেহালায়, ছবিতে পুষ্পস্তবক দিয়েছেন। 

সংবাদপত্রের অফিসে নিয়ে গেছেন।


গাড়ি থেকে নেমে সুনিবেশকে বলেছেন, 'আমি এই প্রথম তোমার অনুমতি ছাড়া কিছু করব। মাপ ক'রো।'


সাংবাদিকদের সামনে গিয়ে বলেছেন, 'কালকের সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় লিখবেন, 'সুপ্রিয়, অনুপমার সূর্য, সুনিবেশ বৃক্ষের ঔরস।'

-----------–----

SUJATA MISHRA