আজগুবি ধাবা

বাবা রে বাবা...মস্ত ধাবা

তার ভিতরে ঘর আর ঘর

জ্বলছে চুলা কনের মাথায়

ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট বর।


বাবা রে বাবা... বিয়ের ধাবা

বরের এবার ঘুম ভেঙেছে

শিঙ নেড়ে যেই আসছে ষাঁড়

হুক্কাহুয়া ডাক ছেড়েছে।


বিয়েবাড়ির ভুরি ভোজে

লঙ্কা পেঁয়াজ রসুন আদা

হুতোম প্যাঁচা বরের মামার

পিসের মাসির আপন দাদা।


বর ডাকলে, কই রে হুতোম!

বউটা আমার গেল কই?

আমড়া চুষে বউ বললে,

আমি তো আর কনে নই!


আমি হতে পারি রুই

আচ্ছা তবে হই পুঁটি?

ষাঁড় বললে, ভীষণ মজা!

বিয়ে বাড়ির আজ ছুটি!


বাবা রে বাবা... ফাঁকা ধাবা

মুরগি খোঁটে নরম ঘাস,

ঘোঁতন বরের চোখের জলে

ডুব দিচ্ছে পাতি হাঁস।


কনের চোখেও জলের ঘড়া

গোলদিঘিতে ভরতে যায়…

মস্ত ধাবা একলা বসে

ডিগবাজি আর খাবি খায়।

----------------------

24. 03. 2021


ইচ্ছে

বড় হয়ে কী হতে চাও?

আমি বলব মাস্টারমশাই?

শানু এগিয়ে এসে বলল, ডাক্তার হব আমি।

মাস্টারমশাই ঘাড় হেলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

ডাক্তার কেন? 

শানু এবার মাথা নিচু করে ফেলে।

মাস্টারমশাই আবার জিজ্ঞেস করেন, বলো!

ডাক্তার হতে তোমার ভালো লাগে?

না...মায়ের।

টুসি, তোতা, অনি সবাই একে একে বলে

ফেলে মায়ের ইচ্ছে, বাবার ইচ্ছে।

ডাক্তার যদি কোনোক্রমে না হতে পারে তবে

ইঞ্জিনিয়ার তো হতেই হবে তাদের!

নিদেনপক্ষে টিচার

তার কম কিছুতেই না!


সবচেয়ে শান্ত ছেলেটি তখনও চুপ করে আছে।

মাস্টারমশাই তার মাথায় হাত রাখতেই সে বলে

ওঠে, মাস্টারমশাই! আমি ঠাকুর হতে চাই।


মাস্টারমশাই তো ভীষণ অবাক!

এইটুকু ছেলে, তার মধ্যে ঈশ্বর হওয়ার

চেতনা কেমন করে আসে!

কেমন করে সে অনুভব করে বিবেক, বোধ,

ভালোবাসা দিয়ে গড়া নিজের অন্তর

ঈশ্বর হয়ে যায় ধীরে ধীরে…

সে এইটুকু বয়সে কী করে উপলব্ধি করে এই ধারণা?

নিশ্চই তার বাবা মায়ের ভীষণ ভালো শিক্ষা।

নিশ্চই তাকে শেখানো হয়, তুমি চাইলে

রোদ্দুর কিংবা ঝর্ণা হতেও পারো।


মাস্টারমশাই এক বুক খুশি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

ঠাকুর কেন, বাবা?

ছেলেটি উত্তর দিল, আমার বাবা মা ঠাকুমা

সবাই শুধু ঠাকুরকেই ভালোবাসে।

ঠাকুর বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার ভয় পায়।

ঠাকুমা যত্ন করে খাওয়ায়। স্নান করায়।

ঠাকুর পড়ে না তাও তাকে কেউ বকে না।

ঠাকুরকে কেউ রাত থাকতে বিছানা থেকে টেনে তুলে হোম ওয়ার্ক করতে বলে না।


আমি ঠাকুর হলে আমার বাবা মা

সবসময় আর আমায় বকবে না!

আমি ঠাকুরের মত ঘুমোতে পারব!


মাস্টারমশাই আর কোনোদিন জানতে চান না,

কোন শিশু বড় হয়ে কী হতে চায়।

-------------

Sujata Mishra

ইল্যাটিং বিল্যাটিং সই লো

ইল্যাটিং বিল্যাটিং সই লো

কীসের খবর পাই লো

রাজা মশাই বলে গেছেন

একটি বালিকা চাই লো…


রাজামশাই বলে গেছেন,

একটি বালিকা চাই লো…


বালিকার নাম মল্লিকা। বাড়ি মাটির, ছাত টিনের।

বালিকার বাবা দিনমজুর, মা মৃত।

বালিকা বিশ্বাস করে, মৃতের জগৎ থেকে তার মা

তার জন্য রোজ সাহস পাঠায়। তেজ পাঠায়।


মল্লিকার চোখে আগুন, বুকে উদ্যম।

বাবার ভাগ-ক্ষেতে বৃষ্টি মাখতে মাখতে

সে গান সাজায়, ফসল বোনে।

কড়া রোদ্দুরে ভিজতে ভিজতে কুড়ুল চালায়,

সবুজ বসায়, বাসা বাঁধে।

মল্লিকা ইস্কুলে যায়। চুল বাঁধে। কালো কুচকুচে

মুখে হাসি আনে। মল্লিকা উঠানে চুলা জ্বালে।


ভাত ফোটায়, ফুল ফোটায়, পায়ের নিচে

মাটি গড়ে। মল্লিকা বাঁচতে জানে।


ইস্কুল পেরিয়ে কলেজ, কলেজ শেষে 

ইউনিভার্সিটি… 

কালো মেয়ের চোখের আগুন 

প্রকাশিত হয় সংবাদপত্রে টিভিতে...রেডিওয়।

ট্রেনে একলা একা ডাকাতদল ধরেছিল সে!


মল্লিকা বীরাঙ্গনা হয়ে ওঠে।

মল্লিকা তেজ জ্বালে, মল্লিকা গানও জানে।

ফসলে মাখামাখি হয় তার ঘাম।

পাড়া পড়শী ভুলে যায় ফুল দিয়েই তার নাম।


মল্লিকা লাঠি চালায়। বাজার করে। রান্না চড়ায়।

প্রথম হয়। খোঁপাও বাঁধে।

মল্লিকা কাঁদে!


মূর্তি গড়েন মানস বাবু…

তিনি কালো চুলে কালো ফুল

এঁকে বললেন, আর কেঁদো না মেয়ে!

আমায় ফসল তোলা শিখিয়ে দাও!


মল্লিকার শক্ত হাত।

মানস বাবুর নরম চোখ।

মল্লিকার খোঁপায় দুলে উঠল চাঁপার বাগানখানা।

সে বলল, রাজামশাই! ফসল তোলার আগে

যে বুনতে হয় গো!

এই নাও বীজ। ছড়িয়ে দাও পুবের মেঘে।

দেখো, সকাল কেমন জন্ম নেবে রাতের মাটিতে!

রাজামশাই দু চোখ বুজে বলেন, আমার কেবল

মল্লিকা যে চাই!


পড়শীরা সব গেয়ে উঠল।

ক্ষেত ও বৃষ্টি দুলে উঠল।

ফুলগুলো সব বলে উঠল…


ইল্যাটিং বিল্যাটিং সই লো

কীসের খবর পাই লো

রাজামশাই বলে গেছেন, মল্লিকা বালিকা চাই গো!

---------------

Sujata Mishra

আগুন নেবে!

আগুন চাই! আগুন!

যজ্ঞের আগুন...যুদ্ধের আগুন...জিভের আগুন

...আগুন চাই! আগুন!

এই তো বাতাস...বলো কী চাই তোমার?

ও ফাগুন চাই! বসন্তের আগুন।

এই নাও! এই এক মুঠো।

দোলের দিন আসব কিন্তু, আমার আগুন

রঙ আমাকেও খানিক মাখিয়ে দিও।


আগুন নেবে…

আগুন!

এইতো গাছ! নাও, সবুজ আগুন।

সাবধানে রেখ। 

যাই, আকাশকে বজ্র আর নীল দিয়ে আসি।


আগুন নেবে...আগুন...


হ্যাঁ মাটি আসছি। বলো, কোন আগুনটা নেবে?

আমার কাছে হরেক রকম আছে।

তেজের আগুন, গনগনে লাল

রাগের রঙ হলুদ…

অভিমান যদি চাও, চুপিচুপি শিশির মাসে

সেও দিতে পারি রোদ্দুর রঙের মস্ত

আগুন বাড়ি!

কী গো, বলো! 

কোনটা বললে? এটা?

এই যে ফ্যাকাশে? নয়?

তবে এটা? এটা সহ্যের, নেবে?

ও এটাও নয়? তবে…

কোনটা?

এই মাটি...ওইদিকে আর হাত বাড়িও না!

ওই কোনে লুকানো আছে যেটা

ওটা টেনে এন না!

ওটা তো মৃত্যুর আগুন!

আমি তোমায় দিতে পারব না।


কী বললে, সইতে পারছ না আর?


মা যে তুমি! তোমার তো অসীম ধৈর্য্য…


তুমি বরং এই একমুঠো সাহস রাখো।

মাঝে মাঝে শিকড় দুলিয়ে দিও

অন্ধকার ছিঁড়ে ফেলো

বন্যা দিয়ে ধুইয়ে দিও লোভ…

এই নাও, প্রতিবাদের আগুন

একবার ছুঁড়লেই দেখো…

আর তোমার আগুন প্রয়োজনই হবে না!


আমি যাই। মাকে আমি মৃত্যু বিক্রি

করতে পারব না গো।


আগুন নেবে! আগুন…

------------

Sujata Mishra

চারুলতা

...চারু...দরজা খোল!

দরজার ভিতরে সিলিং থেকে ঝুলছিল মৃত চারু।


তার পায়ের নিচে মাটি নেই, বাতাস খেলছিল। মাথার উপর পাথর নয়, মাথা নিজেই হালকা হয়ে লুটিয়ে পড়েছিল ফাঁসির দড়ির গায়ে। চোখের কোলে কান্না নয়, ঠান্ডা ঘুম ঝরে পড়ছিল তার।


না, চারু দরজা খোলেনি। বাইরে থেকে ধাক্কা দিয়ে সে ঘরের দরজা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করেছিল তার অনাত্মীয় বাড়ির লোকজনেরা।  


চারুর অবশ্য মৃত্যু সেদিনই হয়েছিল যেদিন সে পৃথিবীতে প্রথম জন্ম নিয়েছিল। চার দিদির পরেও সে কন্যা হয়েই মায়ের কোলে এল...এই তো তার মৃত্যুর জন্য বড় কারণ! তাই তার কান্নায় বিগলিত হলেন না মা। বিরক্ত হলেন বাবা, কাকা, জ্যাঠা।

ঠাকুমা নাম রেখেছিলেন চারুলতা। বলেছিলেন, হোক না মেয়ে! মানুষ তো! দাদু হেসে বলেছিলেন, মেয়েমানুষ। 


ঠাকুমার মৃত্যুর পর দাদু বুঝেছিলেন মেয়েমানুষ পুরুষকে ছেড়ে চলে গেলে কী হয়। 


চারুর পরে আরো দুজন দুই পুরুষাঙ্গ নিয়ে একসাথে নেমে আসে মায়ের কোলে। মা প্রসব বেদনা ভুলে নেচে গেয়ে উঠতে চান যেন সেই মুহূর্তে! বাবা চারুসহ অন্য বোনদের বুঝিয়ে দেন, তোমাদের সব আলো ফুরালো এবার। নটে গাছ মুড়ালো... এটা কী আর বলতে পারেন বাপ হয়ে!


চারুর চার সু-কন্যা দিদির সুপাত্রে বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেল শীঘ্রই। চারুর বেলাই দেখা গেল মুশকিল। আসলে চারু ভাইদের পড়াশুনা শুনে শুনে মুখস্ত করে ফেলে তাড়াতাড়ি, গান গাইতে পারে রেডিওর সুরে সুরে, আকাশ নদী গাছ পাখি এমনকি বাতাসও আঁকতে পারে ভারী সুন্দর কিন্তু মায়ের হাজার শিক্ষাতেও সে বাসন মাজা, কুটনো কোটা, কাপড় কাচা, সেলাই ফোঁড়াই এসবে একেবারে দক্ষ নয়। ভীষণ মার, বকুনি কোনোকিছুতেই তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করেনা এসব। তাই পাত্রপক্ষের সামনে বারবার নাজেহাল হতে হয় চারুর বাবা মাকে। পাত্রের মা যদি জিজ্ঞেস করেন, সোয়েটার বুনতে পারো? চারু দুদিকে মাথা হেলিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলতে শুরু করে, আমি বিশেষ কিছুই পারিনা।


তবুও অনেক কষ্টে চারুর বিয়ে ঠিক হল অবশেষে একদিন। চারুর চার দিদি ভালো মত শিখিয়ে পড়িয়ে দিল, মুখে মুখে কথা বলবি না, সব সহ্য করবি। কালশিটে, লাথি ঝাঁটা, আধ পেটা ভাত, সব…


চারু চলে গেল। 


বছর ঘুরতে না ঘুরতেই চারু ফিরে এল। 

তার শাশুড়ি লিখে পাঠিয়েছে তারই হাত দিয়ে…

আপনাদের মেয়ে সংসারের অনুপযুক্ত একেবারেই, আমার ছেলের আবার বিয়ে দিতে চাই। 


চারুলতা বেঁচে আছে, এটাই আর কেউ মনে রাখতে চায়না। চারু বারবার বাঁচতে চায়, ছবি আঁকে, গুনগুন গান গায় চিলেকোঠার ঘরে।

চারুর ছবি ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ভাই। তার আকাশকে পায়ে মাড়িয়ে যান তার বাবা। ভাতের থালায় অভিশাপ মিশিয়ে তরকারি ঢেলে দেন মা। হা হুতাশ করে দিদিরা। 

চারু তবুও পথ বোনে। 


চারু পথ বোনে। দিনের পর দিন।

দিনের পর দিন,

সময়ের পর সময়।


তার বাড়ির আত্মীয়রা তার আত্মা ছাড়িয়ে অনেক দূরের পাতাল থেকে শব্দ পাঠায়…

চারু, বেঁচে আছিস?


চারু পথ বোনে। একটা একটা করে কাঁটা সরিয়ে একটাই ফুল দেখতে চায়, মেঘ সরিয়ে আকাশ।

কিন্তু দুটোতেই কেবল একটাই বাক্য শোনে সে, ...তুই বেঁচে আছিস চারু?


সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলছে চারু। 


তার পায়ের নিচে বাতাস যেমন খুশি তেমন উড়ছে, ভাসছে, আঁকছে। তারা যেন চারুর মৃত্যুতে আনন্দ করছে!

তাদের কাছে চারুর যেন এই প্রথমবার জন্ম হল।


...চারু তুই এ কী করলি? 

তার বাবা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে। বিস্মিত বাবা যেন প্রথম কন্যার মৃত্যু দর্শন করলেন!


পাশের বাড়ির কোনো এক ছাত্র রবীন্দ্রনাথ পড়ছিল…


চারুলতাও মরে গিয়ে প্রমাণ করে গেল, সে বাঁচতে চেয়ে বারবার মরলেও এতদিন বেঁচেই ছিল!

––––––––––

SUJATA MISHRA

নষ্ট

দু কামরার ঘর, ছোট্ট ডাইনিং, একটা রান্নাঘর…

আমি, ভাই, বাবা, মা, হাবু কাকা গাদাগাদি ঠাসাঠাসি। একটা বিড়াল ব্যালকনি দিয়ে এসে রান্নাঘরে উঁকি দেয়। সুযোগ পেলেই দুধের বাটিতে গোঁফ চোবায়। মা খুন্তি ছোঁড়ে, মর মর!


আমার বিয়ের ফুল ফোটাতে চায় আমার মা, বাবা। চায়ের কাপে চুমুক দেয় ডাইনিংয়ে বসা লোকগুলো। বাবা মিউ মিউ করে বলতে শুরু করে, আমার মেয়ে রান্না বান্না সেলাই ফোঁড়াই সব পারে, শুধু বুদ্ধি একটু হালকা…

গলায় লাগে গরম চায়ে ডোবানো ঠোঁটগুলোর।


ওরা চলে গেলে মা ঝাঁটা তোলে, মর মর আবাগি!


ভাইয়ের বন্ধুর সরু গোঁফ, চওড়া বুক। আমার চোয়াল ছুঁয়ে চুক চুক করে, আহা রে এমন সুন্দর মুখ মামনদির! 

লোডশেডিং হয়ে যায় ঠাসাঠাসি ঘরে। মা বাবা বাজারে, হাবু কাকা ক্লাবে, ভাইয়ের পায়খানার চাপ…

ভাইয়ের বন্ধুর হাত নেমে আসে বুকে, নাভিতে, বিছানায়…


আমার মা আমায় মেরে মেরে মাড়িয়ে যাওয়া ধানক্ষেত বানিয়ে দেয়। গলা টিপে ধরে ভাই, নষ্ট একটা! ধিক্কার ছুঁড়ে দেয়। 

ক্ষ্যাপা পাগলের আবার শরীর! হাবু কাকা বলে। 

বাবা মাকে বলে, ওকে জিজ্ঞেস করো এ আগাছার বীজ কে পুঁতেছে জমিতে? 

কাঁদতে কাঁদতে বলি, ভাইয়ের বন্ধু কুশল…


কুশল আসে। হাসে। মুখ ভেঙায়।


দুই কামরার ঘরে কাঁদার ঘর আর বুক আছড়ানোর তক্তাপোষ কোনোটাই নেই আমার।


ভাই জোরে জোরে বৈষ্ণব পদাবলী পড়ে। মরণ রে তুহু মম শ্যাম সমান…

আমার তো বুদ্ধি হালকা। এসব কী এত সহজে বুঝতে পারি?


বড় বড় আলোর নীচে শুইয়ে ডাক্তার ছিঁড়ে নেয় কুঁড়ি। 


দু কামরার ঘরের মধ্যেই একটা ছোট্ট স্টোররুম, সেইখানে বাঁধা হয় আমায়। আমার বাক রুদ্ধ হয়। 


ভালোই! নইলে আমার হৃদয় ফুঁড়ে আসা বুদ্ধিহীন প্রশ্নটা মাকে অতিষ্ট করে তুলত…


ও মা! মাগো! কুশল কেন নষ্ট নয়? 

-----------------

SUJATA MISHRA

মায়া

তোকে কতবার বলেছি, এ বাড়ির ধারে কাছে তুই আর আসবি না! ফের কেন এসেছিস তুই?

প্রাসাদোপম বাড়ির দারোয়ান আজও মেয়েটিকে প্রতিদিনের মত একই কথা বলে গেট থেকে দূর দূর করে বের করে দিল রাস্তায়। মেয়েটাও কাঁদতে কাঁদতে মিলিয়ে গেল শোঁ শোঁ ছুটে যাওয়া গাড়ির কেটে যাওয়া বাতাসের ধাক্কায় অথবা উড়ন্ত ধুলোর স্রোতে।


তবুও মেয়েটা রোজ আসে। মস্ত বাড়িটার সামনে দাঁড়ায়। রক্ষী গালিগালাজ করে ঠেলে দেয় পথে।

মাসখানেক চলার পরে একদিন মেয়েটার ডাক পড়ে ভিতরে। দুরুদুরু বুকে একরাশ খুশি নিয়ে মেয়েটা ভিতরে প্রবেশ করে। ঘরের দরজায় পা রাখতেই তার অপেক্ষার মানুষটি গম্ভীর কন্ঠে বলে

ওঠেন...নাম কী?

মেয়েটা মুখ নামিয়ে উত্তর দেয়, মায়া।

মানুষটি আবার জিজ্ঞেস করেন, কেন একমাস ধরে প্রতিদিন আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য এসেছিলে? কিছু কি বলার আছে আমায়?

মেয়েটা যেন লজ্জায় আরো মাথা নামিয়ে নিল। তারপর বলল, একবার শুধু জড়িয়ে ধরবেন আমায়?

মানুষটা থমকে গেলেন। তারপর মেয়েটার নিচু মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, এস! 

মেয়েটা এসে মানুষটার বুকে মাথা রাখল। মানুষটাকে তার দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল।

তারপর মানুষটার বুকে মেয়েটা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, কিন্তু আর নড়ল না।


দারোয়ান, কাজের লোক, ড্রাইভার, মালি ছুটে এল সকলে। মানুষটার বুক থেকে মেয়েটার মৃত শরীর নামিয়ে রাখল বিছানায়।


পুলিশ এল, মিডিয়া এল, কাকের মুখে খবর জানল পথ ঘাট, চায়ের দোকান, মাছের হাট…

কিছুদিনের জন্য বাড়িতে অনুপস্থিত মানুষটার স্ত্রী ফিরে এলেন বাড়ি, কান্নাকাটি এবং অগ্নি বিসর্জনের পর আবার বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। প্রচুর লোকজন, ক্যামেরা, হই হই এর মধ্যে মানুষটা সম্পূর্ণ একা। 


ইন্সপেক্টর এসে বললেন, রাকেশবাবু, আর যাই হোক আপনার বয়সটা একটু ভেবে দেখতে পারতেন! মেয়েটার পিঠে বুকে কালশিটে, দাঁতের কামড়...যাই হোক এই বয়সে এমন একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেললেন, দেখি আপনার জন্য কী সুবিধা করতে পারি। চলি! বলে ফিরে যেতে গিয়েও ইন্সপেক্টর ফিরে এলেন মানুষটার কাছে। 

ফিসফিস করে বললেন, এই বয়সে এমন এনার্জি ভাবা যায়না মশাই! আপনার সিক্রেটটা একটু জেনে যাব পরে এসে কিন্তু!


পরের দিন সারা দেশ জেনে গেল প্রখ্যাত বৃদ্ধ অভিনেতা রাকেশ জানা এক পঁচিশ বছরের তরুণীকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছেন তাঁর নিজেরই বাড়িতে। বাড়ির পরিচারক হঠাৎ দেখে ফেলায় হাতে নাতে ধরা পড়েছেন তিনি। 


মানুষটার জীবনে নিঃসন্তান দাম্পত্য এতই সুখের যে রুপোলি জগৎও তাতে ঈর্ষান্বিত। 

তবুও মানুষটাকে কেউ বিশ্বাস করল না। মানুষটা ইচ্ছে করেই অভিমানে কারো কাছে নিজের কথা বলল না। একটানা চুপচাপ বসে থাকার পর মেয়েটার সঙ্গে আনা ব্যাগটা যা পুলিশের চোখ এড়িয়েই গিয়েছিল, হঠাৎ মানুষটা তার থেকে এক ছেঁড়া খোঁড়া ডায়েরি বের করে সামনে খুলে বসল। মেয়েটার মৃত্যুর পর থেকেই যে তাঁর খুব জানতে ইচ্ছে করছে, কে ছিল সেই মেয়ে? কেন এসেছিল তার কাছে এত আকুতি নিয়ে? কেন তার বুকে মাথা দিয়েই ঢলে পড়ল সে মৃত্যুতে?


ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা

... মা, তুমিও তোমার মায়াকে ছেড়ে চলে গেলে? এখন কে আমায় বাঁচিয়ে রাখবে এ পৃথিবীতে?

তারপরের প্রত্যেক পাতায় মায়ার কাকু কাকিমার অত্যাচার, অশিক্ষিত মদ্যপের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া, তার অত্যাচার এসবের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আছে। 

কিন্তু কোথাও মানুষটার কথা তো লেখা নেই! তবে মেয়েটা একমাস ধরে রোজ কেন আসত তার বাড়ির সামনে? 

ডায়েরি আবার ব্যাগে ভরতে যাওয়ার ঠিক মুহূর্তে পুরানো জ্যালজেলে ডায়েরির পাতার ভাঁজ থেকে খসে পড়ল রাকেশবাবুর অল্পবয়সের এক ছবি। উল্টো পিঠে লেখা, তোমার মেয়ে মায়া...পৃথিবী তো ভীষণ ছোট! যদি কোনোদিন দেখা হয় চিনে নিও। 


মানুষটার কানের সামনে এক ফিসফিসে সুর ভেসে এল হঠাৎ, 

...রাকেশদা, এবার কী হবে? যদি কিছু হয়? 

...রাকেশদা! আমায় বিয়ে করবে তো?

মানুষটার ঠোঁট নড়ে উঠল, ...নিশ্চই করব! শুধু একবার সিনেমায় চান্সটা পেয়ে যাই!

...তুই কিন্তু অপেক্ষা করবি পুতুল! তোকে কী ভুলতে পারি রে, এই তো মায়া!


মনে পড়েছে! রাকেশবাবুর সব মনে পড়েছে। এত বড় অপরাধ করেছেন তিনি! রুপোলি জগতের স্রোতে ভেসে কবে যেন বেমালুম ভুলে গেছেন তাঁর পুতুলকে...তাঁদের সম্পর্কের মায়াকে। 


ইন্সপেক্টর এলেন মানুষটার কাছে। 

বললেন, মেয়েটার নাম মায়া। ওর বর মদ গাঁজা মেয়েমানুষ এই নিয়েই বুঝলেন কিনা…

রোজ বউ পেটাত। তাই মেয়েটির গায়ে কালশিটে ছিল। খেতে পরতেও দিতনা ঠিকঠাক। হার্টের প্রবলেমও ছিল মেয়েটার। 

এই মাসখানেক হল ওরা ওই কলপারের বস্তিপাড়ায় এসে থাকতে শুরু করেছিল। মেয়েটির মৃত্যু যে কার্ডিয়াক আরাষ্টে হয়েছে, পোস্টমর্টেমে এখন তো তা পরিষ্কার। আর আপনার তাকে ধর্ষণের কোনো চিহ্ন পাওয়াও যায়নি। শুধু মরতে যে কেন আপনার কাছে এল, এটাই প্রশ্ন সবার এখন!



বৃদ্ধ মানুষটির বালিশের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে খিলখিল হাসি, ও বাবা! এবার বলো, কেমন শাস্তি দিলাম তোমায়? আমার মাকে ভুলে আমায় যন্ত্রণায় ফেলে এসেছিলে তাই না?

মানুষটা সেই স্বর ধরতে চান দুহাত দিয়ে জড়িয়ে! জীবনের সব সুখের একমাত্র অসুখটা হাউ হাউ করে ঢেলে দেন সেই স্বরে…

...মায়া! আর একবার বুকে আয়, মা'রে!

-----------------

SUJATA MISHRA