আগুন নেবে!

আগুন চাই! আগুন!

যজ্ঞের আগুন...যুদ্ধের আগুন...জিভের আগুন

...আগুন চাই! আগুন!

এই তো বাতাস...বলো কী চাই তোমার?

ও ফাগুন চাই! বসন্তের আগুন।

এই নাও! এই এক মুঠো।

দোলের দিন আসব কিন্তু, আমার আগুন

রঙ আমাকেও খানিক মাখিয়ে দিও।


আগুন নেবে…

আগুন!

এইতো গাছ! নাও, সবুজ আগুন।

সাবধানে রেখ। 

যাই, আকাশকে বজ্র আর নীল দিয়ে আসি।


আগুন নেবে...আগুন...


হ্যাঁ মাটি আসছি। বলো, কোন আগুনটা নেবে?

আমার কাছে হরেক রকম আছে।

তেজের আগুন, গনগনে লাল

রাগের রঙ হলুদ…

অভিমান যদি চাও, চুপিচুপি শিশির মাসে

সেও দিতে পারি রোদ্দুর রঙের মস্ত

আগুন বাড়ি!

কী গো, বলো! 

কোনটা বললে? এটা?

এই যে ফ্যাকাশে? নয়?

তবে এটা? এটা সহ্যের, নেবে?

ও এটাও নয়? তবে…

কোনটা?

এই মাটি...ওইদিকে আর হাত বাড়িও না!

ওই কোনে লুকানো আছে যেটা

ওটা টেনে এন না!

ওটা তো মৃত্যুর আগুন!

আমি তোমায় দিতে পারব না।


কী বললে, সইতে পারছ না আর?


মা যে তুমি! তোমার তো অসীম ধৈর্য্য…


তুমি বরং এই একমুঠো সাহস রাখো।

মাঝে মাঝে শিকড় দুলিয়ে দিও

অন্ধকার ছিঁড়ে ফেলো

বন্যা দিয়ে ধুইয়ে দিও লোভ…

এই নাও, প্রতিবাদের আগুন

একবার ছুঁড়লেই দেখো…

আর তোমার আগুন প্রয়োজনই হবে না!


আমি যাই। মাকে আমি মৃত্যু বিক্রি

করতে পারব না গো।


আগুন নেবে! আগুন…

------------

Sujata Mishra

চারুলতা

...চারু...দরজা খোল!

দরজার ভিতরে সিলিং থেকে ঝুলছিল মৃত চারু।


তার পায়ের নিচে মাটি নেই, বাতাস খেলছিল। মাথার উপর পাথর নয়, মাথা নিজেই হালকা হয়ে লুটিয়ে পড়েছিল ফাঁসির দড়ির গায়ে। চোখের কোলে কান্না নয়, ঠান্ডা ঘুম ঝরে পড়ছিল তার।


না, চারু দরজা খোলেনি। বাইরে থেকে ধাক্কা দিয়ে সে ঘরের দরজা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করেছিল তার অনাত্মীয় বাড়ির লোকজনেরা।  


চারুর অবশ্য মৃত্যু সেদিনই হয়েছিল যেদিন সে পৃথিবীতে প্রথম জন্ম নিয়েছিল। চার দিদির পরেও সে কন্যা হয়েই মায়ের কোলে এল...এই তো তার মৃত্যুর জন্য বড় কারণ! তাই তার কান্নায় বিগলিত হলেন না মা। বিরক্ত হলেন বাবা, কাকা, জ্যাঠা।

ঠাকুমা নাম রেখেছিলেন চারুলতা। বলেছিলেন, হোক না মেয়ে! মানুষ তো! দাদু হেসে বলেছিলেন, মেয়েমানুষ। 


ঠাকুমার মৃত্যুর পর দাদু বুঝেছিলেন মেয়েমানুষ পুরুষকে ছেড়ে চলে গেলে কী হয়। 


চারুর পরে আরো দুজন দুই পুরুষাঙ্গ নিয়ে একসাথে নেমে আসে মায়ের কোলে। মা প্রসব বেদনা ভুলে নেচে গেয়ে উঠতে চান যেন সেই মুহূর্তে! বাবা চারুসহ অন্য বোনদের বুঝিয়ে দেন, তোমাদের সব আলো ফুরালো এবার। নটে গাছ মুড়ালো... এটা কী আর বলতে পারেন বাপ হয়ে!


চারুর চার সু-কন্যা দিদির সুপাত্রে বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেল শীঘ্রই। চারুর বেলাই দেখা গেল মুশকিল। আসলে চারু ভাইদের পড়াশুনা শুনে শুনে মুখস্ত করে ফেলে তাড়াতাড়ি, গান গাইতে পারে রেডিওর সুরে সুরে, আকাশ নদী গাছ পাখি এমনকি বাতাসও আঁকতে পারে ভারী সুন্দর কিন্তু মায়ের হাজার শিক্ষাতেও সে বাসন মাজা, কুটনো কোটা, কাপড় কাচা, সেলাই ফোঁড়াই এসবে একেবারে দক্ষ নয়। ভীষণ মার, বকুনি কোনোকিছুতেই তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করেনা এসব। তাই পাত্রপক্ষের সামনে বারবার নাজেহাল হতে হয় চারুর বাবা মাকে। পাত্রের মা যদি জিজ্ঞেস করেন, সোয়েটার বুনতে পারো? চারু দুদিকে মাথা হেলিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলতে শুরু করে, আমি বিশেষ কিছুই পারিনা।


তবুও অনেক কষ্টে চারুর বিয়ে ঠিক হল অবশেষে একদিন। চারুর চার দিদি ভালো মত শিখিয়ে পড়িয়ে দিল, মুখে মুখে কথা বলবি না, সব সহ্য করবি। কালশিটে, লাথি ঝাঁটা, আধ পেটা ভাত, সব…


চারু চলে গেল। 


বছর ঘুরতে না ঘুরতেই চারু ফিরে এল। 

তার শাশুড়ি লিখে পাঠিয়েছে তারই হাত দিয়ে…

আপনাদের মেয়ে সংসারের অনুপযুক্ত একেবারেই, আমার ছেলের আবার বিয়ে দিতে চাই। 


চারুলতা বেঁচে আছে, এটাই আর কেউ মনে রাখতে চায়না। চারু বারবার বাঁচতে চায়, ছবি আঁকে, গুনগুন গান গায় চিলেকোঠার ঘরে।

চারুর ছবি ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ভাই। তার আকাশকে পায়ে মাড়িয়ে যান তার বাবা। ভাতের থালায় অভিশাপ মিশিয়ে তরকারি ঢেলে দেন মা। হা হুতাশ করে দিদিরা। 

চারু তবুও পথ বোনে। 


চারু পথ বোনে। দিনের পর দিন।

দিনের পর দিন,

সময়ের পর সময়।


তার বাড়ির আত্মীয়রা তার আত্মা ছাড়িয়ে অনেক দূরের পাতাল থেকে শব্দ পাঠায়…

চারু, বেঁচে আছিস?


চারু পথ বোনে। একটা একটা করে কাঁটা সরিয়ে একটাই ফুল দেখতে চায়, মেঘ সরিয়ে আকাশ।

কিন্তু দুটোতেই কেবল একটাই বাক্য শোনে সে, ...তুই বেঁচে আছিস চারু?


সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলছে চারু। 


তার পায়ের নিচে বাতাস যেমন খুশি তেমন উড়ছে, ভাসছে, আঁকছে। তারা যেন চারুর মৃত্যুতে আনন্দ করছে!

তাদের কাছে চারুর যেন এই প্রথমবার জন্ম হল।


...চারু তুই এ কী করলি? 

তার বাবা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে। বিস্মিত বাবা যেন প্রথম কন্যার মৃত্যু দর্শন করলেন!


পাশের বাড়ির কোনো এক ছাত্র রবীন্দ্রনাথ পড়ছিল…


চারুলতাও মরে গিয়ে প্রমাণ করে গেল, সে বাঁচতে চেয়ে বারবার মরলেও এতদিন বেঁচেই ছিল!

––––––––––

SUJATA MISHRA

নষ্ট

দু কামরার ঘর, ছোট্ট ডাইনিং, একটা রান্নাঘর…

আমি, ভাই, বাবা, মা, হাবু কাকা গাদাগাদি ঠাসাঠাসি। একটা বিড়াল ব্যালকনি দিয়ে এসে রান্নাঘরে উঁকি দেয়। সুযোগ পেলেই দুধের বাটিতে গোঁফ চোবায়। মা খুন্তি ছোঁড়ে, মর মর!


আমার বিয়ের ফুল ফোটাতে চায় আমার মা, বাবা। চায়ের কাপে চুমুক দেয় ডাইনিংয়ে বসা লোকগুলো। বাবা মিউ মিউ করে বলতে শুরু করে, আমার মেয়ে রান্না বান্না সেলাই ফোঁড়াই সব পারে, শুধু বুদ্ধি একটু হালকা…

গলায় লাগে গরম চায়ে ডোবানো ঠোঁটগুলোর।


ওরা চলে গেলে মা ঝাঁটা তোলে, মর মর আবাগি!


ভাইয়ের বন্ধুর সরু গোঁফ, চওড়া বুক। আমার চোয়াল ছুঁয়ে চুক চুক করে, আহা রে এমন সুন্দর মুখ মামনদির! 

লোডশেডিং হয়ে যায় ঠাসাঠাসি ঘরে। মা বাবা বাজারে, হাবু কাকা ক্লাবে, ভাইয়ের পায়খানার চাপ…

ভাইয়ের বন্ধুর হাত নেমে আসে বুকে, নাভিতে, বিছানায়…


আমার মা আমায় মেরে মেরে মাড়িয়ে যাওয়া ধানক্ষেত বানিয়ে দেয়। গলা টিপে ধরে ভাই, নষ্ট একটা! ধিক্কার ছুঁড়ে দেয়। 

ক্ষ্যাপা পাগলের আবার শরীর! হাবু কাকা বলে। 

বাবা মাকে বলে, ওকে জিজ্ঞেস করো এ আগাছার বীজ কে পুঁতেছে জমিতে? 

কাঁদতে কাঁদতে বলি, ভাইয়ের বন্ধু কুশল…


কুশল আসে। হাসে। মুখ ভেঙায়।


দুই কামরার ঘরে কাঁদার ঘর আর বুক আছড়ানোর তক্তাপোষ কোনোটাই নেই আমার।


ভাই জোরে জোরে বৈষ্ণব পদাবলী পড়ে। মরণ রে তুহু মম শ্যাম সমান…

আমার তো বুদ্ধি হালকা। এসব কী এত সহজে বুঝতে পারি?


বড় বড় আলোর নীচে শুইয়ে ডাক্তার ছিঁড়ে নেয় কুঁড়ি। 


দু কামরার ঘরের মধ্যেই একটা ছোট্ট স্টোররুম, সেইখানে বাঁধা হয় আমায়। আমার বাক রুদ্ধ হয়। 


ভালোই! নইলে আমার হৃদয় ফুঁড়ে আসা বুদ্ধিহীন প্রশ্নটা মাকে অতিষ্ট করে তুলত…


ও মা! মাগো! কুশল কেন নষ্ট নয়? 

-----------------

SUJATA MISHRA

মায়া

তোকে কতবার বলেছি, এ বাড়ির ধারে কাছে তুই আর আসবি না! ফের কেন এসেছিস তুই?

প্রাসাদোপম বাড়ির দারোয়ান আজও মেয়েটিকে প্রতিদিনের মত একই কথা বলে গেট থেকে দূর দূর করে বের করে দিল রাস্তায়। মেয়েটাও কাঁদতে কাঁদতে মিলিয়ে গেল শোঁ শোঁ ছুটে যাওয়া গাড়ির কেটে যাওয়া বাতাসের ধাক্কায় অথবা উড়ন্ত ধুলোর স্রোতে।


তবুও মেয়েটা রোজ আসে। মস্ত বাড়িটার সামনে দাঁড়ায়। রক্ষী গালিগালাজ করে ঠেলে দেয় পথে।

মাসখানেক চলার পরে একদিন মেয়েটার ডাক পড়ে ভিতরে। দুরুদুরু বুকে একরাশ খুশি নিয়ে মেয়েটা ভিতরে প্রবেশ করে। ঘরের দরজায় পা রাখতেই তার অপেক্ষার মানুষটি গম্ভীর কন্ঠে বলে

ওঠেন...নাম কী?

মেয়েটা মুখ নামিয়ে উত্তর দেয়, মায়া।

মানুষটি আবার জিজ্ঞেস করেন, কেন একমাস ধরে প্রতিদিন আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য এসেছিলে? কিছু কি বলার আছে আমায়?

মেয়েটা যেন লজ্জায় আরো মাথা নামিয়ে নিল। তারপর বলল, একবার শুধু জড়িয়ে ধরবেন আমায়?

মানুষটা থমকে গেলেন। তারপর মেয়েটার নিচু মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, এস! 

মেয়েটা এসে মানুষটার বুকে মাথা রাখল। মানুষটাকে তার দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল।

তারপর মানুষটার বুকে মেয়েটা এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, কিন্তু আর নড়ল না।


দারোয়ান, কাজের লোক, ড্রাইভার, মালি ছুটে এল সকলে। মানুষটার বুক থেকে মেয়েটার মৃত শরীর নামিয়ে রাখল বিছানায়।


পুলিশ এল, মিডিয়া এল, কাকের মুখে খবর জানল পথ ঘাট, চায়ের দোকান, মাছের হাট…

কিছুদিনের জন্য বাড়িতে অনুপস্থিত মানুষটার স্ত্রী ফিরে এলেন বাড়ি, কান্নাকাটি এবং অগ্নি বিসর্জনের পর আবার বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। প্রচুর লোকজন, ক্যামেরা, হই হই এর মধ্যে মানুষটা সম্পূর্ণ একা। 


ইন্সপেক্টর এসে বললেন, রাকেশবাবু, আর যাই হোক আপনার বয়সটা একটু ভেবে দেখতে পারতেন! মেয়েটার পিঠে বুকে কালশিটে, দাঁতের কামড়...যাই হোক এই বয়সে এমন একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেললেন, দেখি আপনার জন্য কী সুবিধা করতে পারি। চলি! বলে ফিরে যেতে গিয়েও ইন্সপেক্টর ফিরে এলেন মানুষটার কাছে। 

ফিসফিস করে বললেন, এই বয়সে এমন এনার্জি ভাবা যায়না মশাই! আপনার সিক্রেটটা একটু জেনে যাব পরে এসে কিন্তু!


পরের দিন সারা দেশ জেনে গেল প্রখ্যাত বৃদ্ধ অভিনেতা রাকেশ জানা এক পঁচিশ বছরের তরুণীকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছেন তাঁর নিজেরই বাড়িতে। বাড়ির পরিচারক হঠাৎ দেখে ফেলায় হাতে নাতে ধরা পড়েছেন তিনি। 


মানুষটার জীবনে নিঃসন্তান দাম্পত্য এতই সুখের যে রুপোলি জগৎও তাতে ঈর্ষান্বিত। 

তবুও মানুষটাকে কেউ বিশ্বাস করল না। মানুষটা ইচ্ছে করেই অভিমানে কারো কাছে নিজের কথা বলল না। একটানা চুপচাপ বসে থাকার পর মেয়েটার সঙ্গে আনা ব্যাগটা যা পুলিশের চোখ এড়িয়েই গিয়েছিল, হঠাৎ মানুষটা তার থেকে এক ছেঁড়া খোঁড়া ডায়েরি বের করে সামনে খুলে বসল। মেয়েটার মৃত্যুর পর থেকেই যে তাঁর খুব জানতে ইচ্ছে করছে, কে ছিল সেই মেয়ে? কেন এসেছিল তার কাছে এত আকুতি নিয়ে? কেন তার বুকে মাথা দিয়েই ঢলে পড়ল সে মৃত্যুতে?


ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা

... মা, তুমিও তোমার মায়াকে ছেড়ে চলে গেলে? এখন কে আমায় বাঁচিয়ে রাখবে এ পৃথিবীতে?

তারপরের প্রত্যেক পাতায় মায়ার কাকু কাকিমার অত্যাচার, অশিক্ষিত মদ্যপের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া, তার অত্যাচার এসবের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আছে। 

কিন্তু কোথাও মানুষটার কথা তো লেখা নেই! তবে মেয়েটা একমাস ধরে রোজ কেন আসত তার বাড়ির সামনে? 

ডায়েরি আবার ব্যাগে ভরতে যাওয়ার ঠিক মুহূর্তে পুরানো জ্যালজেলে ডায়েরির পাতার ভাঁজ থেকে খসে পড়ল রাকেশবাবুর অল্পবয়সের এক ছবি। উল্টো পিঠে লেখা, তোমার মেয়ে মায়া...পৃথিবী তো ভীষণ ছোট! যদি কোনোদিন দেখা হয় চিনে নিও। 


মানুষটার কানের সামনে এক ফিসফিসে সুর ভেসে এল হঠাৎ, 

...রাকেশদা, এবার কী হবে? যদি কিছু হয়? 

...রাকেশদা! আমায় বিয়ে করবে তো?

মানুষটার ঠোঁট নড়ে উঠল, ...নিশ্চই করব! শুধু একবার সিনেমায় চান্সটা পেয়ে যাই!

...তুই কিন্তু অপেক্ষা করবি পুতুল! তোকে কী ভুলতে পারি রে, এই তো মায়া!


মনে পড়েছে! রাকেশবাবুর সব মনে পড়েছে। এত বড় অপরাধ করেছেন তিনি! রুপোলি জগতের স্রোতে ভেসে কবে যেন বেমালুম ভুলে গেছেন তাঁর পুতুলকে...তাঁদের সম্পর্কের মায়াকে। 


ইন্সপেক্টর এলেন মানুষটার কাছে। 

বললেন, মেয়েটার নাম মায়া। ওর বর মদ গাঁজা মেয়েমানুষ এই নিয়েই বুঝলেন কিনা…

রোজ বউ পেটাত। তাই মেয়েটির গায়ে কালশিটে ছিল। খেতে পরতেও দিতনা ঠিকঠাক। হার্টের প্রবলেমও ছিল মেয়েটার। 

এই মাসখানেক হল ওরা ওই কলপারের বস্তিপাড়ায় এসে থাকতে শুরু করেছিল। মেয়েটির মৃত্যু যে কার্ডিয়াক আরাষ্টে হয়েছে, পোস্টমর্টেমে এখন তো তা পরিষ্কার। আর আপনার তাকে ধর্ষণের কোনো চিহ্ন পাওয়াও যায়নি। শুধু মরতে যে কেন আপনার কাছে এল, এটাই প্রশ্ন সবার এখন!



বৃদ্ধ মানুষটির বালিশের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে খিলখিল হাসি, ও বাবা! এবার বলো, কেমন শাস্তি দিলাম তোমায়? আমার মাকে ভুলে আমায় যন্ত্রণায় ফেলে এসেছিলে তাই না?

মানুষটা সেই স্বর ধরতে চান দুহাত দিয়ে জড়িয়ে! জীবনের সব সুখের একমাত্র অসুখটা হাউ হাউ করে ঢেলে দেন সেই স্বরে…

...মায়া! আর একবার বুকে আয়, মা'রে!

-----------------

SUJATA MISHRA

দ্বিভূজা-রূপেণ...

ভোলার মায়ের বড় আয়োজন!

রাত থাকতে উঠে মাটির দুয়ার নিকিয়ে রেখেছে।

দিঘি থেকে তুলে এনেছে লাল পদ্ম।

ভোলা নদীর ধারে গিয়ে কাশ ফুলের

শ্বেত ভেলা বানিয়ে এনে রেখেছে 

মায়ের আয়োজনে।


একটু সকাল হতেই পাড়ার লোকে

উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে ভোলার মায়ের বাড়ি।

কেউ কেউ জিজ্ঞেস করছে বেড়ার ফাঁক

দিয়ে, ও ভোলার মা! এত আয়োজন!

তা তোমার ঠাকুর কই?

কেউ বললো,

...এই যে এ বছর নিজে নিজে দুগ্গা আনছো,

টাকা কড়ি বেশ ভালোই হয়েছে তবে বলো!


কিছুক্ষণ পরে ভোলার মায়ের দরজায় গাড়ি

থামলো এক।

নেমে এলো তসরের শাড়ি পরা এক ছিপছিপে রমণী।

ভোলার মা দৌড়ে গিয়ে তার হাত ধরে নিয়ে এলো

সেই আয়োজনে। 

আল্পনা আঁকা পিড়ি পেতে বললো, এসো মা দুগ্গা!

উঁকি মারা মুখ গুলো বিস্ময়ে চমকে ওঠে...

এটা কী রকম হলো!

তসরের শরীর সেই ছিপছিপে রমণী ভোলার মাকে 

জড়িয়ে বলে, কী বলছো তুমি?

আমি এক নিঃসন্তান সামান্য নারী!

ভোলার মা বেড়ার বাইরের দিকে উত্তর ছুঁড়ে দিল,

...মহালয়ায় দেখেছি অসুর নিধনে দেবতারা 

সব শক্তি একত্রিত করে জন্ম দেয় দশভূজার!

এই যে কমাস আগে মস্ত অসুখ গেল!

আমার ভোলা পড়লো সে অসুখে,

তুমি মা গো! 

ওর মায়ের মতন ওকে বাঁচিয়ে আনলে

হাসপাতাল থেকে!

নিধন করলে অসুখাসুর।

সবচেয়ে বড় যে অসুর; অভাব!

তার দিকে তুমি ধরলে তোমার দয়ার ত্রিশূল খানি তুলে,

কাজ না করেও আমি তোমার দানে পেট ভর্তি খাবার পেলাম, 

ঝড়ে উড়ে যাওয়া ঘরের নতুন ছাদ পেলাম।

বলো তো মা! তুমি না তো, কে আর দুর্গা আমার?


বাইরের ভিড় কমে যেতে লাগলো।

ছিপছিপে রমণীর গাল দিয়ে নেমে এলো গঙ্গা।

ভোলার মা ভোলাকে বললো, ভোলা প্রণাম কর!

আমাদের ঘরে স্বয়ং দেবী এসেছেন আজ!

অঞ্জলি নাও গো মা, আমাদের ...

দ্বিভূজা-রূপেণ সংস্থিতা!

নমস্তস্যৈ নমঃ নমঃ।

------------------

Sujata Mishra


বন্ধু

_ এই রাহুল! কেমন আছিস? বাব্বা কতদিন পরে দেখা আমাদের! 

_ হ্যাঁ রে চয়ন! এই ভয়ংকর অসুখ পেরিয়ে তবে তো আবার একসাথে হওয়া! দেখ না, মা-দুগ্গার মুখটাও কেমন মনখারাপ মনখারাপ!

রাহুল আর চয়ন বন্ধু। অসুখ শেষের পরে যখন মা দুর্গা এসেছেন মণ্ডপে মণ্ডপে, যখন অসুখ কমে এসেছে প্রায় একেবারেই, যখন সমাজে আবার শুরু হয়েছে নতুন ছন্দ, সেই সময় সপ্তমীর সকালে দুই বন্ধুর দেখা পাড়ায় ঠাকুর দেখতে গিয়ে। কথা বলতে বলতেই তাদের মধ্যে এসে উপস্থিত হলো বিজিত, সৌম্য, পলাশরাও। হঠাৎ সৌম্যর চোখ পড়লো রাহুলের জামার দিকে, অবাক দৃষ্টিতে বললো, সব তো বুঝলাম রাহুল! কিন্তু পুজোর সকালে তুই নতুন জামা পরিসনি কেন? রাহুল ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসলো, বললো এমনি পরিনি রে। তোরা তো পরেছিস! বাঃ দেখতে কত ভালো লাগছে!

চয়ন বললো, আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। বিকেলে আমরা একটু ঘুরতে যাবো সবাই তৈরি হয়ে এইখানে চলে আসবি কিন্তু।


বিকেলে আবার সেই পাড়ার মণ্ডপে এসে হাজির হলো সব বন্ধুরা। সবার গায়ে সুন্দর নতুন পোশাকের আভিজাত্য, মনে আনন্দ। রাহুলও একটা সুন্দর আকাশি রঙের জামা পরে এসেছে। এবার ভ্রু কুঁচকে বিজিত বললো, রাহুল! এই জামাটা তো তোর আগের বছরের! তোর কাকু এনে দিয়েছিল কলকাতা থেকে! কী ব্যাপার বলতো? তোর বাবা তোকে একটাও জামা কিনে দেয়নি এবার? পলাশ হো হো করে হেসে উঠে বললো, আরে তোরা জানিস না? ওর বাবার কাজ নেই তো আর! লকডাউনের সময় গেছে সেটা!

ওরা বোধহয় খেতেও পায়না আর দেখ গিয়ে!

রাহুল বুঝতে পারলো না, বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গে নতুন পোশাকের কী সম্পর্ক? তবে জীবনে প্রথমবার বুঝতে পারলো সেই ছোটবেলা থেকে এই ক্লাস এইট অবধি যাদের ও বন্ধু বলে মনে করেছে, তারা কেউ ওর বন্ধু নয়। কান্না চেপে বাড়ি ফিরে গেল সে।


অষ্টমীর পুজো দেখতে এসে বিজিত, পলাশ, সৌম্য আর চয়ন দেখে, তাদের পাড়ার সবচেয়ে গরীব মানুষ হারু কাকার চার ছেলে মেয়ে হাসতে হাসতে নতুন জামা পরে মণ্ডপে আসছে, হাতে পুজোর প্রসাদ নিয়ে আনন্দে ঘুরছে চারিদিক। সৌম্য ভারী অবাক হয়ে পলাশকে বলে, এত সুন্দর দামি দামি পোশাক ওরা কোথায় পেলো বলতো? পাশ থেকে শুনতে পেল হারু কাকার বড় ছেলে রাজু। বললো কেন! আমাদের বন্ধু দিয়েছে!

পলাশ মুখ বেঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে, তোদের আবার বন্ধু! কে রে সে? স্বয়ং ভগবান নাকি? এমন সুন্দর সুন্দর জামা দেয়…

হারু কাকার মেয়ে রুমা ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই বলে, শুধু জামা নয় গো, সেই ষষ্ঠী থেকে পেট পুরে খেতে পাচ্ছি আমরা! রাহুল দাদা আমাদের খুব ভালোবাসে, বন্ধু তো এমনই হয়, তাই না দাদারা?

কারো মুখ থেকে একটাও কথা বেরোয় না আর।


রাহুলের বাবার কাজ চলে যাওয়ার পরে তাদের বড় কষ্টে দিন কাটছে এটা ঠিক, তবুও তার বাবা রাহুলের কোনো অভাব রাখেননা, ভালোবেসে সবচেয়ে ভালো জামাই কিনতে চেয়েছিলেন পুজোয়, কিন্তু কেনাকাটা করার তোড়জোড় শুরু হতেই রাহুল তার সারা বছরের জমানো টাকার ছোট্ট বাক্সটা বের করে সে বাবার হাত দুটো ধরে তার মনের ইচ্ছাটা বলে। হারু কাকার বড় ছেলে রাজু রাহুলকে খুব ভালোবাসে। পেয়ারা এনে দেয় বাগান থেকে পেড়ে, পুকুরে নেমে শিখিয়ে দেয় সাঁতার, কেবল ওরা স্কুলে যায়না তাই রাহুলের মা ওদের সঙ্গে মিশতে দেননা বিশেষ। কিন্তু রাহুলের এরকম প্রস্তাবে তার বাবার সাথে সাথে মাও খুব খুশি হয়ে ওঠেন, নিজে মুখে বলেন পুজোর চারদিন ওরা আমাদের লক্ষ্মী, গণেশ, সরস্বতী, আর কার্তিক হবে তবে। ওদের পেট পুরে খাওয়াবো। রাহুল তো আনন্দে একেবারে কেঁদেই ফেলে।


সৌম্য, বিজিত, পলাশ চয়ন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। বুকের ভিতর এক উথালপাতাল আফসোস। 

কিছুক্ষণ পরে রাহুল তার আগের বছরের পুরনো জামা পরে মণ্ডপে ঢোকে। রাজু ছুটে এসে বুকে জড়িয়ে নেয় তাকে, নতুন আর পুরানো পোশাক মিলে গিয়ে সৃষ্টি হয় বন্ধুত্বের সংজ্ঞা। মা দুর্গার মুখে মনখারাপ মনখারাপ ভাবটা কেটে গিয়ে আলো ফুটে ওঠে একরাশ... 

রাহুল চয়নদের বিষন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়ায়...বন্ধু হবি ফের একবার?

-----------–-------

Sujata Mishra

সংরক্ষণ ও মধ্যবিত্ত মার্কশিট

 


আমার নাম পার্বতী, পদবী বন্দ্যোপাধ্যায়।

মধ্যবিত্ত উচ্চশিক্ষার মার্কশিট আর নিম্নবিত্ত উঠোনের

মালিকানা ছিল আমার।

খুব ছোটোতেই বাবার মারণ ব্যাধি ধরা পড়েছিল।

মাধ্যমিকের এক মাস আগে অস্তাচলে চলে গেল

আমার মাথায় অসুস্থ অভাবী হাত রাখার প্রথম সেই স্নেহ।


সাদা থানে মোড়া মা বুঝতো না ফসলের হিসেব।

বাসন মাজার কাজ চাইতে গেলে ভদ্র দরজা চমকে উঠলো, 

...সে কী! ব্যানার্জী বাড়ির বউ!

জমির ধান, আলু ঘরে তুলে নিল কাকা।

আমি আর মা একসঙ্গে লড়াই করতে করতে 

উচ্চমাধ্যমিকের আগে ঝরে গেল মা।

নিভু নিভু সূর্যের দিকে তাকিয়ে আমি আমার অস্তাচলের 

রাস্তা খুঁজলাম,

কাকা বললো, বেশ বেশ অত কান্নাকাটির দরকার নেই, 

থাকবি, খাবি তোর কাকিমার দুটো কাজ করে দিবি…


পাড়ার লোকে কাকাকে খুব হিংসে করলো,

দাদার সম্পত্তি পেয়েছে অথচ মেয়েটাকে পড়াবে না!

জেদ করে কাকা আমাকে ভর্তি করে দিল কলেজে।

কাকিমার হাঁড়ি মুখ আরো হাঁড়ি দেখতে দেখতে আমি

সপ্তাহে দু একদিন কলেজ যেতাম।

কালি ঝুলি মেখে কাজ শেষ হলেই পরীক্ষার পড়া

মুখস্ত করতাম।

কাকিমা খোঁটা দিত পুজোর জোগাড়ে ভুল হলেও,

বামুন বাড়ির অলক্ষ্মী একটা! কোনো কাজ জানে না!

কাকার মেয়ে আমার চুলের মুঠি ধরে দেখিয়ে দিত,

ইস্ত্রির কোনখানে কোঁচ রয়ে গেছে।

আমার চোখে এত জল থাকতো যে পরীক্ষার প্রশ্নই

ভালো করে দেখতে পেতাম না।

তবুও মধ্যবিত্ত মার্কশিট ভরে চলেছি ঝোলায়।

বাবার জমির ফসল বিক্রি করে গয়না পরেছে কাকিমা।


আমার নিম্নবিত্ত উঠোনে একদিন ভীষণ রাগ নেমে এলো।

ঝোলা হাতে বেরিয়ে পড়লাম চুপিচুপি,

রাস্তায় রাস্তায় চিৎকার করলাম, কেউ ভিক্ষে দেবে!

দৃষ্টি থামিয়ে পথ বললো ...নাম কী?

ধীরে ধীরে বললাম, পার্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়।

পথ দ্রুত এগোতে লাগলো।

বললো, হবে না হবে না। সংরক্ষণ চাই!

ইংরেজিতে যাকে বলে রিজার্ভেশন, বুঝেছো!

ভিক্ষেতেও রিজার্ভেশন?

পথ বললো আমার সঙ্গে এসো, ওই যে অফিস

ওখানে যাও, বলো কাজ চাই!

আমি এক ছুটে এগিয়ে গেলাম, চকচকে দিদিমণির

সামনে সব মার্কশিট উজাড় করে দিলাম।

উনি উল্টে পাল্টে বললেন, নাঃ! একে বন্দ্যোপাধ্যায়,

তায় মান মধ্য, অন্য কোনো কিছু হলে নাহয় বুঝতাম!


বেরিয়ে আসতেই পথ বললো, ওই দেখো ছোট অফিস, 

বেতন কম। যাও গিয়ে বলো।

আমি ভিতরে ঢুকে ঝোলা খুলতেই একমুখ দাড়ি বাবু

হাঁ হাঁ করে উঠলো, এ কী! এত ডিগ্রি! না না 

আপনার মর্যাদা রাখতে পারবো না এখানে সব ওই প্রাইমারি!

আমি ছিটকে বেরিয়ে এলাম।

পথ খুব জোরে হাসলো,

বাতাস আমার কানের পাশে এসে কেটে কেটে বলল

একে পার্বতী, দুইয়ে বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনে অসংরক্ষণ!

চারে…


আমি ছুটলাম, কেবল ছুটলাম।

নিম্নবিত্ত উঠোনের মাঝখানে এসে দাঁড়ালাম।

আমার চারিদিকে গিজগিজ করছে কাকার লোভ,

কাকিমার গয়না, মধ্যবিত্ত মার্কশিট, অসংরক্ষণ আর

এত বড় পদবী ...বন্দ্যোপাধ্যায়!

আমি আমার পায়ের তলার মাটিতে আছাড় খেলাম বারবার!

চিৎকার করলাম আকাশের দিকে তাকিয়ে…

আমি যদি পার্বতী, তবে আমার নটরাজ কই?

যে আমার দেহ কাঁধে নিয়ে ক্রোধে উদ্দাম নৃত্য করতে করতে বলবে, সংরক্ষণ কেন!

পদবী কেন?

নামের পরে শুধু মানুষ নয় কেন?


আমি পার্বতী, পদবী বন্দ্যোপাধ্যায়।

মাটির ভিতরে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে আমার ঝোলা

মধ্যবিত্ত মার্কশিট, আর নিম্নবিত্ত উঠোন।

শুধু কোনো নটরাজ এলো না আমার শরীরের এই বোঝ

কাঁধে তুলে নিতে।

এত বড় পদবী আর সংরক্ষিত সম্মানকে পীঠে ছড়িয়ে দিতে!

যদি দিত তবে সে সব পীঠের নাম হতো, 

না-সংরক্ষণ পীঠ, না-ভিক্ষা পীঠ, না-পদবী পিঠ।


আমি গর্ভ গৃহে প্রবেশ করে যাচ্ছি ক্রমশ!

চারিদিকের সংরক্ষণ সংরক্ষণ চিৎকারটা 

ঢাকা দিয়ে দিচ্ছে আমার অস্তিত্ব।


অনেক বছর পরে এক কবি এসে মাটির গন্ধ শুঁকে

তার খাতায় লিখে নিল, 

এই মাটিতে ডুবে আছে আনন্দ! 

সৃষ্টির কোনো সংরক্ষণ হয় না যে!

----------------------

Sujata Mishra