আমি সময়

সেই কোন্ যুগ থেকে যে আমি হেঁটে চলেছি
আমি নিজেও জানি না
শুধু জানি হাঁটতে হবে, ছুটতে হবে
কোথাও থেমে থাকা চলবে না।

আমি কে?
সময়। 
সময় কোথা আমার সময় কাটাবার?
সময় কোথায় আমার সময় হারানোর?
আমি সময়। পৃথিবীর হাত ধরে এগিয়ে চলি।
লীন হয়ে যায় আমার অতীত
বর্তমান প্রবল ছোটে ভবিষ্যত ছোঁয়ার জন্য
আমি সময়।
সময় কোথায় পিছিয়ে আসার জন্য?

ভালোবেসে ছেলেটা মেয়েটাকে বলেছিল
একটু সময় দাও। চাকরিটা পেয়েই তোমায় 
বাড়ি নিয়ে আসবো…
মেয়েটার হাতে আমি তো ছিলাম না! 
ছিল তাড়া। বড়লোক পাত্রে বিয়ে হয়ে গেল তার।
বছর দুয়েক আমিও ছুটলাম খুব।
ফিরে এল মেয়েটা। অত্যাচারে। 
এখন মেয়েটার হাতে আমি অগুনতি হয়ে বসে আছি
পুকুর ঘাটে, কলতলায়…

পৃথিবী বাঁধা আমার হাতে। 
দিন রাত্তির ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত আমি
তবু আমার সময় তো নেই বসে থাকবার
তবু ডাক দিয়ে যাই স্বপ্ন দেখা চোখে,
এস, আমার আঙুল ধরো।
ছুটতে শেখ…

খুব ইচ্ছে করে শিশুর হাসিতে এসে থেমে থাকি
বেশ কিছুক্ষণ
কিন্তু আকাশ ছুঁতে চেয়ে আমাকে টেনে ধরে।
সেও ছোটে…

আমি কে?
আমি সময়।
—------------------
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

মানুষ - মিছিল

ডাস্টবিনের পাশে যেদিন উন্মাদ নগ্ন দেহটা যন্ত্রণায়
চিৎকার করে উঠল কেউ এল না পাশে
রাতের অন্ধকার চিরে
কয়েকটি কুকুর উলঙ্গ লোভ নিয়ে দাঁড়ালো উন্মাদিনীর চারপাশে

জন্ম নিল ছোট্ট কচি প্রাণ।
উন্মাদিনীর চোখে আগুন জ্বলে উঠল প্রথমবার
সে তার আঁচলে চেপে ধরল স্নেহ
কাঁচের টুকরো তুলে ছুঁড়ে মারল লোলুপ কুকুরগুলোর দিকে
তারপর জড়িয়ে জাপটে আগল দিল তার কোলে

ছোট্ট প্রাণ স্থান পায় এক বৃহৎ প্রাণে
উন্মাদিনী বলে, যা যা তুই যা আমি জেগে আছি
সন্তানহীনা একজন বুকে তুলে নেয় তাকে
উন্মাদিনী কে দেয় অন্ন বস্ত্র
কিন্তু তার অত সময় কোথা সময় নষ্ট করবার
সারাদিন ধরে সে কাঁচ কুড়োয়, বুকের ভিতর
আরো আরো বজ্র বাঁধে তার
সন্তান হীনা বিস্মিত হয়। 
রাত গভীর হলে উন্মাদ মায়ের স্রোত ভেসে আসে কণ্ঠে…সা…বধান! 

সব কুকুর থেমে যায়। সব মানুষ ভয় পায়।
উন্মাদিনী প্রবল ঝড় এখন, ধরতে গেলেই
ছুঁড়ে ফেলে, বুকের দিকে হাত বাড়ালেই
ঝনঝন করে ওঠে কাঁচ, রক্তের গন্ধে ম ম করে পথ

পৃথিবী উন্মাদিনীর নাম রেখেছে মা।

সারা রাত্তির অস্ত্র হওয়ার পরে সূর্য উঠলে সে মা
খানিক ঘুমিয়ে নেয়। 
তারপর ডাস্টবিন খেতে খেতে গান ধরে
আমরা সবাই রাজা
সেই কবে যেন সে শিখেছিল এ গান

ধীরে ধীরে মা বৃক্ষ হয়। 
সেই বৃক্ষের নিচে এসে বসে ছোট ছোট প্রাণ
নিশ্চিন্তে নির্ভয়ে।

পালিকা মা তার মেয়ের নাম রেখেছে প্রীতিলতা।
আবর্জনা সরিয়ে ফেলে সে মেয়ে গাছ জড়িয়ে ধরে
বলে, কেন মা আমার সঙ্গে গেলে না?
উন্মাদিনী হাসে। 

পৃথিবী বলে, তোর উন্মাদিনী মা এখন মাতঙ্গিনি রে! 
মানুষ মিছিলের সামনে থাকতে হবে না? 
—----------------------
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

ঘুম

ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে'
ওদের ঘুম ভাঙাও! 
সারি সারি উলঙ্গ রাজা সাজানো দোকানের সামনে
ওরা এসে দাঁড়িয়েছে।
সবাই দেখছে বুঝছে কিন্তু বলছে না কিছুই
ওদের হৃদয় ভর্তি ঘৃণা
ধিক্কার
তবু ওরা প্রশ্ন করছে না…
ওদের বুকের ভিতর যে পিতা ঘুমিয়ে
যদি তার ঘুম ভাঙ্গে এ অসময়ে
তবে সে এক প্রবল কণ্ঠস্বরে চিৎকার করবে
বলবে, এ রাজা পোশাক বিহীন!
এ স্বাধীনতা পরাধীন!
গণতন্ত্র বন্দি!

ফিরে এলেন মাতঙ্গিনি, প্রীতিলতা
পতাকা কাঁধে তুললেন সুভাষ
গান্ধীজি এলেন। ক্ষুদিরাম বিনয় বাদল দীনেশ
ননী বালা দেবীও এলেন। 
সভার বিষয় ঠিক হয়েছে ভারতবর্ষ
প্রফুল্ল চাকী বিস্ময়ে বললেন, এ ভারত কি আমারই?
নেতাজি বললেন, তোমরা সাহসী হও! 
আমি তোমাদের বোধ এনে দেব…
ক্ষুদিরাম বলে উঠল, আঠারো কই? আঠারো?
প্রীতিলতা হই হই করে মৃত্যু নিল গলায়
বলল, কারা যেন ঘুমিয়ে আছে…

দুর্দম ইংরেজ এল প্রচন্ড উল্লাসে।
বলল, আমরা কিন্তু পোশাক পরতে জানি
এরা জানে না, জানে না…

শুকনো পথের দুই পাশে কচি ধান ক্ষেতের বাস
চাষীর কাঁধে গামছা কপালে ঘাম
ঘরে আসবে নতুন পৃথিবী 
এবার পুজোয় একটা নাক ছাবি দেবে বউকে সে
তার আনন্দ ধুয়ে যাচ্ছে রোদ্দুরের গানে গানে

সভা শেষ হল এদিকে।
সকল দেশপ্রেমী বাতাস হওয়ার আগে দীর্ঘশ্বাস
ফেলে বলল, এর চেয়ে ভালো ছিল ইংরেজ…
নেতাজি বললেন, কয়েক সহস্র নেতাজির জন্ম
হওয়া দরকার বড়…

চাষীর স্বপ্নের পাশে এসে বসল সময়
বলল, যদি সবটা তোমার হতে পারতাম…

সারি সারি বসানো উলঙ্গ রাজার মূর্তি
সবাই দেখছে কিন্তু কেউ এখনো বলছে না
স্বাধীনতা পরাধীন! 
ওকে মুক্তি দাও!
ওদের ঘুম ভাঙাও!
—-------------------
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

কনকাঞ্জলি

কনে বিদায়ের সময় চোখে জল নিয়ে মেয়ের সামনে আঁচল পেতে ধরল মা… দে! কনকাঞ্জলি দে! 

মেয়ের দুহাতে রবীন্দ্রনাথ ছিল ঠাসা। বাইশে শ্রাবণ ছুঁড়ে দিয়ে বলল, 

রবীন্দ্রনাথ থেকে কেবল এইটুকুই বিয়োগ করা যায় মা!
—------------------
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

স্বপ্নের বাকি আধ খানা না

মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে কারা যেন ঠেলে তুলল
বলল, ওঠ ওঠ এ রাস্তা আজ তোর নয়
দেখছিস না রাজার আসার আয়োজন চলছে
স্বাধীনতা হাতে সোনার রথে আসবে রাজা

স্বপ্ন টা আধখানা দেখা বাকি ছিল তখনো। 
ঘুম ফেলে বিস্ময়ে চোখ মেলে বলি, রাজা আসবে? তবে থাকি এইখানে তার কাছে চেয়ে নেব 
স্বপ্নের বাকি আধখানা…

ঠেলে দিল আরো জোরে, ভাগ বলছি!
শুনছিস রাজার দুহাতে থাকবে স্বাধীনতা
কানে থাকবে গান, ঠোঁটে হাসি
বলি তোর কথা শুনবে বা কী করে, বলবেই বা কী?

হুমড়ি খেয়ে পড়লাম সামনে। 
জন্ম থেকেই এ রাস্তা সে রাস্তায় মানুষ
মানুষ কী আর? লোকে আমায় ফালতু বলেই ডাকে।
কদিন আগে বড় রাস্তার মন্টু এসেছিল 
বলে গেছে তোর বয়স হয়েছে তের
আর দেরি নয়। 
রাজা আসবে তোর গুহায়…

বললাম, শোনো না! শুনছো? 
এ কী মন্টুর রাজা? 
আমার গুহা দেখবে? 
আমি তবে অপেক্ষায় থাকি?

ওরা ভয়ঙ্কর হাসল। বলল, এ রাজার পরনে
কাপড় থাকে…
স্বাধীনতা বাসি হলে আসিস
ছুঁয়ে দেবে তোকে

স্বাধীনতা! স্বাধীনতা! স্বাধীনতা!
কে স্বাধীনতা এটা তো বলে যাও!

দুশ বছর ধরে যে মা অনেক যন্ত্রণা নিয়ে নিয়ে
উনিশ শ সাতচল্লিশে এক সন্তান প্রসব করেছিল
তার নাম স্বাধীনতা!
অন্য কিছু নয়।
তবে তোর মত রাস্তায় পড়ে থাকে না।
মাথায় থাকে। 
জন্মদিন এলেই সে রাজার হাতে চরে
বাজনা বাজে। পতাকা ওড়ে…
তাই তোরা ভিক্ষে পাস, রাস্তা পাস।

কানের কাছে মুখ নামিয়ে ওদেরই একজন বলল
তবে এ ছেলেকে বেয়াদপ করেছে ওই রাজাই
নইলে কী আর রাস্তা ওর একার হয়?
আমাদেরও মুখ বন্ধ রাখতে হয়, নইলে…

ওই তো মন্টু ডাকছে ফালতু ফালতু বলে…
ও খুব জোরে জোরে ডাকছে আমায়
তোদের রাজা স্বাধীনতাকেই যখন বন্দী রেখেছে
আমায় আর কি দেবে?
চলি।
স্বপ্নের বাকি আধ খানা না হয় 
তার রাজার সঙ্গে কচি ধান ক্ষেতে শুয়েই দেখব!
—------------------
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

এই তো আমার স্বাধীনতা!

সকাল বেলায় আমি যখন ফুল হয়ে থাকি
প্রজাপতি ঠিক এসে বসে আমার গায়ে
ঠোঁটে রাখে চুমো। আলতো আদর দিয়ে
বলে, উড়ে যেতে ইচ্ছে হয় না? 
মনে হয় না স্বাধীন হয়ে ভেসে যেতে দূরে?
আমি খিলখিল করে হেসে উঠি।
এই যে তুমি আসো, ভালোবাসো
আমি গন্ধ ছড়াই, ভেসেই তো যাই গো!
এটাই আমার স্বাধীনতা।

দুপুর বেলায় গাছ হয়ে যাই।
পথিক আসে। ছায়ায় বসে।
একদিন এক ছোট্ট শিশু হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলে
তোমার কাছে এক প্রশ্ন রাখতে এলাম
রাখবো?
আমি বললাম আগে আমার ছায়ায় জুরোও। তারপর
রেখো।
সে বললে, আচ্ছা শোনো না! বইতে পেলাম 
তোমার নাকি প্রাণ আছে ঠিক আমারই মত!
তবে যে চলতে পারো না, ছুটতে পারো না, কইতে
নাইতে কিছুই পারো না…
উড়ে যেতে ইচ্ছে হয় না?
মনে হয় না স্বাধীন হয়ে ছুটে যেতে দূরে?
আমি জোরে জোরে হেসে উঠলাম।
পাতাগুলো নড়ে উঠল। ছেলেটা বাতাস পেল 
কপালের ঘাম শুকালো তার।
তার হাতের মধ্যে একটা ফল ফেলে দিয়ে বললাম
এটাই আমার স্বাধীনতা।

বিকেল বেলা হতেই আমি বাড়ির বধূ
খেটে খুটে স্বামী আসবে। শ্বশুর ভাসুর 
সূর্য পশ্চিম ছুঁলেই আমি গা ধুয়ে এসে গান হই
চুল বাঁধি, প্রদীপ জ্বালাই।
স্বামী এসে হাত ধরে বলে, চলো হাওয়া খেয়ে আসি
আমি বলি, রান্না বাকি মশাই!
সে অভিমান করে। রাতের মত খানিক কাব্য করে বলে, ইচ্ছে হয় না উড়ে যেতে?
স্বাধীন হয়ে খুব ভাসতে?
আমি হেসে তাকে জড়িয়ে ধরি।
বলি, এটাই আমার স্বাধীনতা।

আমার বার্ধক্যের চোখে ঘুম নেই
বন্দি ওষুধে অসুখে
যৌবন আমায় না দেখার ভান করে চলে যায়
বৃদ্ধ সময় আমি তাকে ডাকি, এস না গল্প করি!
যুবক বেলা টগবগে স্রোত নিয়ে ছুটে যায়।
কী মনে করে ফিরে আসে বেশ কিছু পরে
এই যে শোনো! ইচ্ছে হয় না ফিরে যেতে?
মনে হয় না স্বাধীন হতে?
শেষের শেষে দাঁড়িয়ে কম্পিত কণ্ঠে আমি বলি,
এই তো নিয়ম!
এই তো আমার স্বাধীনতা!
এই তো আমার স্বাধীনতা।
—------------------
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)

স্বাধীনতা মানে

স্বাধীনতা মানে স্বচ্ছ সবুজ পৃথিবীর বাস
স্বাধীনতা মানে সজোরে বলা, বুক ভরে নাও শ্বাস!

স্বাধীনতা মানে ওই ছেলেটার খিদেয় দিন রাত
স্বাধীনতা মানে ঘুম ঘুম চোখে ধোঁয়া ওঠা ভাত

স্বাধীনতা মানে মাঠ ভরা হাসি শ্যামল কচি ধান
স্বাধীনতা মানে ভারত মাতার নির্ভয় সন্তান…

ছেলেটা ভারী বিস্মিত। এত ধুপ ধুনো…
কীসের আয়োজন?
লোকটা বলে তোরা এসব বুঝবি না রে! তোরা ছোটো জন!

পতাকা উড়ছে দেখছিস? স্বাধীনতা ওর মানে
দেখ দেখ ওই টুকু শিশুও সেটা জানে…

তোদের শুধু খিদে খিদে চাই চাই চাই
খাওয়া ভিন্ন দেশ প্রেম এসব কিছুই নাই?

ওই দেখ রান্না হচ্ছে যা নিয়ে পালা!
ছেলেটা বোঝে স্বাধীনতা মানে শাল্ পাতার উপরে 
গরম খিচুড়ি ঢালা…

স্বাধীনতা পেয়েছি! স্বাধীনতা খেয়েছি! আনন্দ তার ভারী
দেশ মা ভাবে, স্বাধীনতা দেশ ছেড়েছে কবেই…অশিক্ষা মহামারী।
—------------------
SUJAN MITHI (SUJATA MISHRA)